অতৃপ্ত জীবনের ব্যথিত যন্ত্রণায় ঘেরা “কবি শাহ আলম সানি”

সাক্ষাৎকারটি তৈরি করেছেন, এম সাইফুল ইসলাম শাফলু :
কবি শাহ আলম সানি-যিনি একাধারে কবি গীতিকার ও উপন্যাসিক। যদিও তিনি নিজেকে কবি পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। দেশ, ও জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের একটি ধর্ম রয়েছে, যার নাম হলো মানবতা । কবিতা গল্প, সাহিত্যের মধ্যে মানবতার এই সাধনা থাকে বিস্তৃত। যে সাধনা শাহ আলম সানির কবিতায় পাওয়া যায়। তাঁর রচিত কবিতা ও গানগুলো শুনলে মনের মাঝে আধ্যাত্মবোধের জন্ম হয়।
কবি শাহ আলম সানি ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বড়চওনার গায়েন মোড় গ্রামে ( যা এখন কবি পল্লী হিসেবে পরিচিত) তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা মো.হোসেন আলী, মা মোসা. জমেলা আক্তার। দুই ভাই একবোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। ছোট বেলা থেকেই তাঁর ধ্যাণ খেয়াল ছিল লেখালেখির প্রতি। দূর্বলতা ছিল কবি সাহিত্যিকদের প্রতি। কবি গুরু যেমন বলেছিলেন ১৪ বছরের মত ভয়ংকর সময় আর আসেনা,আর তা যে পার করতে পারলো সে যেন বেঁচে গেল। শাহ আলম কৈশোরেই আটকে গেলেন তেমনি এক যুদ্ধে,পরাজিত হয়েছিলেন ভালোবাসা নামক সেই যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু সেই সুখ বেশি সইলোনা তাঁর কপালে। হারিয়ে ফেললেন তার অবুঝ মনের ভালোবাসা, ভাবনার মানবী,কৈশোরের সাথীকে আর তখন আরো চরমে পৌছে গেল কবির লেখনি। তাঁর লেখা কবিতা “বর্ষা” প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে দৈনিক রুপালী পত্রিকায়। শাহ আলম সানির কবিতা বা উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা ধরা পড়ে সেটি হচ্ছে, তাঁর রচনাগুলো প্রায়ই নর-নারীর প্রনয় কেন্দ্রিক,আধ্যাতিক ও আত্মজৈবনিক উপাদানে ভরা। “আমি একদিন মরে যাবো কবিতায় যেমন তিনি লিখেছেন ,”হয়তো আমি মরে যাবো আর বেশিদিন বাঁচবোনা,কবিতা গান আর নৌকার মিছিলে আর কোনদিন নাচবোনা”। তাঁর লেখাগুলো দাম্পত্য ও দাম্পত্য বহির্ভূত সম্পর্কের টানাপোড়নে, প্রেমে-অপ্রেমে,অবহেলা আর অ-প্রাপ্তিতে দাম্পত্য ক্লান্ত নর-নারীর অতৃপ্ত জীবনের ব্যথিত যন্ত্রণায় ঘেরা। অ-সফল প্রেম, অতৃপ্ত দাম্পত্য, বেকারত্ব ও দারিদ্য ও আধ্যাতিকতা তাঁর কবিতাগুলোকে ক্লান্ত করলেও পাঠক খোঁজে পায় তাঁর জীবন বেদনার একটি দিক। শাহ আলম সানি ২০০১ সালে এইচএসসি পাশ করার পর আর পড়াশোনায় মন বসাতে পারেননি। “রাতে যখন আকাশ পানে চেয়ে দেখি চাঁদ,তোমার কথা মনে পড়ে পড়া দেই বাদ”। অনেক পরে হলেও এ কবিতায় তার প্রমাণ মেলে। কবিতা লেখার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস লেখার সাধনা চালিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। তিনি মূলত কবি হলেও তাঁর লেখা উপন্যাস “এক বুক জ্বালা” প্রথম প্রকাশিত হয় একতা প্রকাশনীর ব্যানারে। বাংলা একাডেমির বই মেলায় ২০০৬ সালে। এ কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি উপন্যাসও লিখেন তিনি। তাঁর কবিতা ও গল্পগুলো পড়তে গেলেই নিজের অজান্তে পাঠক যেন ঢুকে পড়ে এক বিষন্ন ও বেদনাময় ভাবনার জগতে,যেন পার্থিব জীবনের সবই মিথ্যে, সেখানে গোলকধাঁধার মতো ঘুরপাক খেতে হয় ব্যর্থ প্রেম, দারিদ্য না পাওয়ার অন্তঃজ্বালা আর অতৃপ্ত দাম্পত্যের নিরানন্দ পরিবেশে। তিনি তাঁর কবিতায় লিখেছেন,”মাঝে মাঝে মধ্যরাতে গৃহত্যাগী হই,পুকুর পাড়ে নদীর ধারে কোথাও বসে রই…তুমি ছাড়া মনের কথা জলের সাথে কই”। কবির কাছে প্রেমের মাহাত্ম,চাওয়া-পাওয়া ও আবেদন, স্বাদ ও পরিপূর্ণতা কিছুই চরিতার্থ হয়নি কিন্তু না পাওয়ার অন্তর্জ্বালা ও বঞ্চনাবোধে কখনোই বিস্মৃত হননি অবুঝ হৃদয়ের এই উদাসী কবি। এসব বঞ্চনাবোধকেই তার কবিত্বের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হিসেবে মনে করেন। তাঁর বেশির ভাগ কবিতাতেই স্বামী বা প্রেমিকটি স্বল্প শিক্ষিত বেকার কিংবা দরিদ্র, স্ত্রী সচ্ছল পরিবারে লালিতা তাই কখনোই মেলেনা প্রত্যাশিত সুুুখের জীবন। ফলে তার জীবনেও চেপে বসে সংসার বিমুখতা। প্রেমিকার সঙ্গে অতৃপ্ত প্রেমের কথা কিংবা কাছে পেয়ে হারিয়ে ফেলা এসব ভেবে দগ্ধ হয় মর্মবেদনায়। শাহ আলম সানির লেখা কবিতায় প্রেম ও বিরহের কথা বেশি থাকলেও ভাষার সরলতায় ভেসে ওঠে পল্লী বাংলার এক মমতাময়ী রুপায়িত জীবন। “ও ভাই যাবে আমার গায়,যেথায় আমার মায়,আমার জন্য দিশেহারা,হইছে পাগলপ্রায়” এ কবিতায় যেমন ফুটে ওঠে তারই মমতাময়ী দৃশ্য। “স্বর্গেও যাবেনা থাকা সখীপুর ছেড়ে,মায়ায় ভরা সখীপুর মন নিয়েছে কেড়ে,ভয়ে কভু কাঁপেনা আমার এই বুক,এই ভেবে আমি যে সখীপুরের লোক”। নিজের ভালোবাসার উপজেলাকে এভাবেই দেখেন কবি। নিজের গ্রাম ও মহল্লা নিয়েও লেখেন অনেক কবিতা,”আরতো কোথাও যাবো নাকো এই গ্রামটি ছেড়ে,একটু কোথাও দূরে গেলেই মন যে থাকে পড়ে,যেই খানেতে সদাই দেখি পাখি ডাকা ভোর,মায়ের মত সেযে আমার প্রিয় গায়েনমোড়”। সহজ সরল কবি শাহ আলম সানি, সাহসীও বটে। তথাকথিত সমাজপতি ও স্বঘোষিত উচু স্তরের রাজনৈতিক মানুষগলোকেও তার লেখায় বুঝান এই সমাজের কাছে তারা কেমন। যারা মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করেন,মানুষের জন্য নয়। যারা মানুষের ভাগ্য নিয়ে রাজনীতি করেন,ভাগ্য বদলানোর জন্য নয়। “এই দেশে নেতা কই অধিকাংশই ছোঁচা,ইচ্ছে করে ঘুষি মাইরা নাকটা করি বোচা”। আধুনিক যুগের গ্রামের কাদামাখা ভাষায় এই কবিতা যার প্রমাণ। কবি তার কবিতায় আজকের অসামাঞ্জস্য পূরণ ও নীতি বিবর্জিত সমাজকেও দেখেন অসহায়রুপে।”দেশটা আজ ঘুষের রাজ্য ঘুষ ছাড়া কিছু হয়না,যে কোন কাজ করতে চাও তুমি ঘুষ ছাড়া কথা কয়না”। তাকে দারিদ্র আর অভাবের টানপোড়ন কখনোই থামাতে পারেনি লেখা থেকে। কবিতার পাশাপাশি তিনি অনেক গানও লিখেছেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত গীতিকার মিল্টন খন্দকারের কাছে তার গান লেখার হাতেখড়ি। যে কারনে ২০১০সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে তিনি পেয়েছেন তালিকা ভুক্ত গীতিকারের মর্যাদা। অভিনয়ও করেছেন বিটিভিতে। বিটিভিতে প্রচার হুমায়ুন আহমেদের একমাত্র মঞ্চনাটক “১৯৭১” এ কৃষকের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। তার সর্বশেষ প্রকাশিত কবিতার বই “ভালোবাসার আত্মসমর্পন” প্রকাশিত হয় শব্দ শিল্পের বানারে বাংলা একাডেমির বই মেলায় ২০১৬ সালে। সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শাহ আলম সাজু,জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী ও সুরকার বেলাল খান ও জাতীয় পর্যায়ের আরো সুধীজন সহ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কেন্দ্রিয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আতাউল মাহমুদ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক শওকত উসমানের পুুত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী ইয়াফেস উসমান প্রধান অতিথী হয়ে যার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কিছুটা রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে আছেন এ কবি। কোন চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না করে তার এলাকা সখিপুরে একটি আদর্শ রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরির প্রত্যাশায় স্বেচছাপ্রণোদিত হয়েই দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর সহযোগী সংগঠন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কালিয়া ইউনিয়ন শাখার সভাপতি হিসেবে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সবার আগে অংশ গ্রহণ ও সমাজকল্যাণমূলক কাজেও তার অংশ গ্রহণ কম নয়। এই এলাকার তরুণদের সমাজ কল্যাণ মুখী করে গড়ে তোলার জন্য তার গ্রামে তরুনদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন “চাদের আলো” ক্লাব। মানুষকে বই পড়ার আহ্বান জানান তিনি।বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়াতেও কাজ করছেন তিনি। কাজ করছেন তার বাড়িতে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার জন্য। কবি শাহ আলম সানির প্রিয় ব্যক্তিত্ব ইঞ্জিনিয়ার আতাউল মাহমুদ। সাহিত্যক ও সাংবাদিক শাহ আলম সাজু, সাংবাদিক এম সাইফুল ইসলাম শাফলু, এবং শিল্পী বেলাল খান তার প্রিয় মানুষ।
বেকারত্ব ও দারিদ্রতার কষাঘাত প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হলেও কখনো হতাশ হননি কবি শাহ আলম সানি। প্রিয়জন হারানোর না বলা বেদনা ও অন্তঃজ্বালায় দগ্ধ এ কবি। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে এখনো ঘর বাধা হয়নি তাঁর। কবি বলেন, “এখনো চেয়ে থাকি আমি সে পথের পানে, কত প্রেম ভালোবাসা তোমারি টানে,কত কথা বলে লোকে তোমাকে ঘিরে,তবে কি তুমি আর আসবেনা ফিরে”।
সাধারণ মানুষের সাথেই বেশি মেশেন গ্রাম বাংলার প্রেমের কবি শাহ আলম সানি। সকলের মাঝে থেকে প্রকৃত শেঁকড়ের টানে বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা ও বাসনা, মাটির প্রতি নির্মোহ মমতা ও ভালোবাসার অস্তিত্ববোধ সর্বদাই জেগে থাকে তার হৃদয়ে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লিখে যেত চান কবিতা। বেঁচে থাকতে চান সাধারণ মানুষের ভালবাসা নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*