বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রিপেইড গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। ২০১৭ সাল থেকে প্রিপেইড মিটার লাগানোর পর থেকে মিটারের ত্রুটি, জটিল পদ্ধতি, বিদ্যুৎ অফিসের অবস্থাপন ইত্যাদি সমস্যার কারণে অটোমেটিক বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে সারা দেশের প্রিপেইড গ্রাহকরা দুর্ভোগ পোহান।
সমস্যাগুলো হলো—প্রিপেইড মিটারের ভিতরের ব্যাটারি ডিসর্চাজ (নষ্ট) হলে হঠাৎ যে কোনো সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। মিটারের বর্তমান অবস্থার ছবি তুলে অনলাইনে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে করতে হয় লিখিত আবেদন। অনুমোদন হতে এক থেকে দুই দিন লাগে। মিটারে ৩০০ টাকা রিচার্জ করার পর অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারী প্রায়ই বলেন, ‘ব্যাটারি নেই চীন থেকে আসলে পাবেন।’ গ্রাহকের অসহায়ত্ব বুঝে কর্মচারী বলেন, ‘বিকল্প ব্যবস্হা করতে পারি অতিরিক্ত টাকা লাগবে।’ ব্যাটারি থাকলে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারী বাসায় গিয়ে মিটারের ভিতর ব্যাটারি স্থাপন করে দেন। অন্য কারো স্থাপনের অনুমতি নেই।
এজন্য কর্মচারীকে ২০০ থেকে ১০০০ টাকা দিতে হয়। সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন বা ঈদসহ যে কোনো বেশি দিন সরকারি ছুটির শুরুতে বা ছুটির সময় ব্যাটারি নষ্ট হলে বিদ্যুৎ বিহীন প্রচণ্ড গরমে, অন্ধকারে, পানি ছাড়া ও বিদ্যুতের বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে ৫/৬ দিন চরম কষ্ট করতে হয়। কারণ সরকারি ছুটির সময় অফিস বন্ধ থাকে। অনাবাসিক (অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মিল কলকারখানা ইত্যাদি) প্রিপেইড গ্রাহকদেরও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। প্রিপেইড মিটারে যে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে বা নষ্ট হলেও অটোমেটিক বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। তখন গ্রাহকদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। বিদ্যুতের নতুন সংযোগের অনুমোদন পাওয়া কঠিন। কারণ হেক্সিং কোম্পানির মিটার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এজন্য উচ্চ মূল্যে প্রিপেইড মিটার কিনতে হয়।
অথচ প্রিপেইড মিটার এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকে হেক্সিং কোম্পানির প্রিপেমেন্ট মিটার ঠিকাদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড হেক্সিং ১১০ কেপি ও ইনহি মিটার দেওয়া শুরু করে। প্রতি মাসে মিটার ভাড়া বাবদ লাগে ৪০ টাকা। স্মার্ট কার্ডের গ্রাহকদের অফিস চলাকালীন একমাত্র বিদু্যত্ অফিসে গিয়ে টাকা রিচার্জ করতে হয়। সাধারণ রিচার্জ কার্ড গ্রাহকরা বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে ফ্রি অথবা মোবাইল ব্যাংক (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) থেকে প্রতি ১০০০ টাকায় ২০ টাকা ফি দিয়ে রিচার্জ করতে হয়। মিটারে টাকা শেষ হলে তিনবার নেগেটিভ ব্যালেন্সে চলে। ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নেওয়া যায়। মিটারের বেসপ্লেট বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারী ছাড়া অন্য কেউ খোলার চেষ্টা করলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় ও মিটার নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সফটওয়ার বা অনলাইনে কোনো সমস্যা থাকলে কাজগুলো বিলম্ব হয়। মিটারের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে গিয়ে পোহাতে হয় হয়রানি ও ঝামেলা।
তবে দালালদের মাধ্যমে কাজ করালে সহজ হয়, কিন্তু টাকা বেশি লাগে। দেশের অসচেতন মানুষের জন্য পদ্ধতিটি জটিল। কিলোওয়াট বাড়ানোর অনুমতি পাওয়া কঠিন। টাকা বেশি খরচ করলে সহজে পাওয়া যায়। মিটার স্থানান্তর, প্রতিস্থাপন, নষ্ট হলে, রিচার্জ কার্ড হারালে, কিলোওয়াট বাড়ানোসহ বিভিন্ন সেবার জন্য অতিরিক্ত ফি বিদ্যুৎ অফিসের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হয় অথবা রিচার্জের সময় টাকা কেটে নেয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এসব সমস্যার সমাধান না করলে অথবা বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ না দিলে গ্রাহকের কিছুই করার নেই। গ্রাহকরা বিদ্যুৎ অফিসের কাছে অসহায়। প্রিপেইড গ্রাহকরা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে জিম্মি। এই জিম্মি দশা থেকে লাখ লাখ প্রিপেইড গ্রাহক বাঁচতে চায়।
