নিজস্ব প্রতিনিধি: টাঙ্গাইল আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আবজাউল আলমকে ঘিরে ঘুষ, হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় আসে তার কর্মকাণ্ড। এরপর একাধিক ভুক্তভোগী সামনে এসে একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৮ মে টাঙ্গাইল আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেও অনেক আবেদনকারীকে নানা অজুহাতে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের মূল ফটকের সামনেই সক্রিয় রয়েছে দালালচক্র। পাশের চায়ের দোকান, কম্পিউটার দোকান এবং আশপাশে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি আবেদনকারীদের কাছে গিয়ে নিজেদের মাধ্যমে পাসপোর্ট করে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। অথচ অফিসের দেয়ালে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে, ‘পাসপোর্ট তৈরির জন্য দালালের শরণাপন্ন হবেন না।’ বাস্তবে সেই নির্দেশনার কোনো কার্যকারিতা দেখা যায়নি।
অনুসন্ধানে কয়েকজন দালাল দাবি করেন, তাদের মাধ্যমে আবেদন করলে লাইনে দাঁড়াতে হয় না এবং অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়।
জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত ১০ বছর মেয়াদি ৪৮ পৃষ্ঠার সাধারণ পাসপোর্টের ফি ৫ হাজার ৭৫০ টাকা এবং জরুরি পাসপোর্টের ফি ৮ হাজার ৫০ টাকা। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই টাকার বাইরে অতিরিক্ত আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা না দিলে অনেক আবেদনকারীর ফাইল আটকে রাখা হয় কিংবা নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি জুনাইদ হাসান নামে এক যুবক অভিযোগ করেন, তার মায়ের নামের ইংরেজি বানান নিয়ে আপত্তি তুলে তার আবেদন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান সহকারী পরিচালক আবজাউল আলম। যদিও জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সব সরকারি নথিতে একই বানান ব্যবহার হয়ে আসছে বলে দাবি করেন তিনি। পরে গত ৩০ জুন তিনি টাঙ্গাইল সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। ভিডিওটির মন্তব্যে অসংখ্য মানুষ একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ, অকারণ হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দালালনির্ভর সেবার অভিযোগ তুলে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। অনেকেই তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
একাধিক সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করেন, দালালের মাধ্যমে জমা দেওয়া ফাইলে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, যা দেখেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি করেন। বিপরীতে সাধারণ আবেদনকারীদের অতিরিক্ত কাগজপত্রের অজুহাতে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় কিংবা দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়।
ভুক্তভোগী হিমেল রহমান বলেন, “সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও কাজ হয়নি। কর্মকর্তা আবেদন নেননি। বাইরে বের হতেই এক দালাল অতিরিক্ত টাকা দিলে একই দিনে সব কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।”
আরেক ভুক্তভোগী নেজামউদ্দিন বলেন, “সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও বানান ও বিভিন্ন কাগজের অজুহাতে আবেদন আটকে দেওয়া হয়। মনে হয়েছে, ইচ্ছা করেই হয়রানি করা হচ্ছে যাতে শেষ পর্যন্ত দালালের কাছে যেতে বাধ্য হই।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবজাউল আলমের বিরুদ্ধে এর আগেও বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এক ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছিল। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে চার্জশিটও অনুমোদিত হয়। তবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, ওই মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন।
এদিকে টাঙ্গাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মুক্তার আশরাফ বলেন, অভিযোগটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে সহকারী পরিচালক আবজাউল আলম বলেন, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওটি খণ্ডিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য প্রচার করা হয়েছে। আবেদনকারীর সঙ্গে তার কোনো বিরোধ হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।