ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ পেলেন টাঙ্গাইলের তরুণ তানজিল আমীন শুভ

নিজস্ব প্রতিনিধি, নিউজ টাঙ্গাইল: আন্তর্জাতিক সম্মানজনক ‘ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ অর্জন করেছেন টাঙ্গাইলের তরুণ সমাজসেবক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘মশাল আলো’র প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান তানজিল আমীন শুভ। প্রায় ১১ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং সমাজে ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এ পুরস্কার পেয়েছেন।

২০১৫ সালে টাঙ্গাইলের একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন স্কুলপড়ুয়া বন্ধুর আড্ডা থেকে যাত্রা শুরু হয় ‘মশাল আলো’র। তখন বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন শুভ। শীতার্ত মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা করে নিজেদের টিফিনের টাকা ও পরিচিতজনদের সহযোগিতায় মাত্র ১০টি শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে বিতরণের উদ্যোগ নেন তাঁরা। ‘Winter Relief-2015’ নামের সেই ছোট উদ্যোগ থেকেই গড়ে ওঠে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি।

প্রায় ১১ বছরের পথচলায় শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৫৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সংগঠনটি। টাঙ্গাইল থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

সংগঠনটির উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নীলফামারীর জলঢাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেখানে টিউবওয়েল স্থাপন শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১৭টি টিউবওয়েল স্থাপন করেছে মশাল আলো। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, এসব উৎস থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষ পানি সংগ্রহ করছেন।

এ ছাড়া ‘Uniform Dreams’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সাল থেকে ৮০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে ইউনিফর্ম ও শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে টাঙ্গাইলের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের একটি বিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে ইউনিফর্ম তৈরির কাপড় উপহার দেওয়া হয়।

‘Project Empowerment’-এর মাধ্যমে অসহায় পরিবারকে সেলাই মেশিন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা করে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি। ২০২৫ সালে সিরাজগঞ্জে এক শিশুর ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস মুদিদোকানটি প্রয়োজনীয় মালামাল দিয়ে আবার চালু করে দেয় তারা।

ফেনীর বন্যায় যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১০ দশমিক ৬৬ মেট্রিক টন খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করে মশাল আলো। এ সময় একটি মেডিকেল টিমের মাধ্যমে ৩০০-এর বেশি মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৫ হাজারের বেশি স্যানিটারি ন্যাপকিন এবং শিশুদের জন্য ১ হাজার ডায়াপার বিতরণ করা হয়।

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজার যুদ্ধকবলিত মানুষের মধ্যে কয়েক দফায় খাদ্য সহায়তা এবং ভ্রাম্যমাণ ট্যাংকের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কর্মশালা আয়োজন করেছে সংগঠনটি। জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজে পেতে ‘Project Life’ নামে একটি অ্যাপ তৈরির কাজও চলছে।

ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় ২৫ বছর বয়সী তানজিল আমীন শুভ মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “অ্যাওয়ার্ডে আমার নাম থাকলেও আমি জানি, এই গল্পটা আমার একার না। এই গল্পটা সেই সব স্বেচ্ছাসেবকের, যারা নিজের পড়াশোনা, টিউশনি, কাজের ফাঁকে সময় বের করে রাত জেগে প্ল্যান করেছে, মাঠে গিয়ে কাজ করেছে। এই পুরস্কারটা আমি আমার বাবা-মা, আমার মশাল আলো পরিবার এবং আমাদের পাশে থাকা প্রত্যেকটা মানুষকে উৎসর্গ করছি।”

শুভ জানান, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ শুরুর দিকে পড়াশোনার ক্ষতির আশঙ্কায় তাঁর বাবা কিছুটা আপত্তি জানালেও পরে সহযোগিতা করেছেন। তবে শুরু থেকেই তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও সহযোগী ছিলেন মা। এ পুরস্কারের জন্য তাঁকে মনোনীত করায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. নুসরাত হাফিজের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অধিকারবঞ্চিত মানুষের জন্য আইনি সহায়তা কার্যক্রম (Legal Aid) চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে মশাল আলো।

তানজিল আমীন শুভ টাঙ্গাইলের সন্তান। তিনি ২০১৬ সালে বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে সরকারি এম. এম. আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ২০২৪ সালে ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে এলএলবি (অনার্স) সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড প্রফেশনসে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। সেখান থেকেই পরিচালনা করছেন মশাল আলোর কার্যক্রম।

এই ধরনের আরও খবর

সর্বশেষ খবর