যুগ যুগ ধরে পরিচালিত মুক্তি সংগ্রাম, রাজনৈতিক কর্মকান্ড, বিভিন্ন নেতার আদর্শ ও দর্শন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন ও চিন্তা ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। যদি তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেখানো হয়, তাহলে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে তার স্থান নির্ণয় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। একইভাবে বঙ্গবন্ধুকে যদি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সম্প্রতি রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলেও বাংলাদেশের আবহমান ঐতিহ্য-
সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা অস্বীকার করতে হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্ব একটি ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছেনÑ যেমন ইতালিতে ম্যাটসিনি ও গ্যারিবল্ডি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতে মহাত্মা গান্ধী, বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুসহ তারা বিশে^র ইতিহাসে মহান নায়ক।
শেখ মুজিবের স্বকীয় নেতৃত্বের আভাস তার কিশোর বয়সের কয়েকটি ঘটনা থেকে আঁচ করা যায়। তিনি কিশোর বয়সে খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নিকট গোপালগঞ্জে নির্ভীক কণ্ঠে তাদের গ্রামের স্কুলের দাবি তুলে ধরেছিলেন। স্কুলে পড়ার সময় এক ঘটনায় প্রতিবাদী ভ‚মিকা গ্রহণের জন্য বালক শেখ মুজিব গ্রেফতার হন এবং সাত দিন হাজতবাস করেন। বিদ্রোহী এই বালক যে এক দিন স্বদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে এমন সম্ভাবনা অনুধাবন করা গিয়েছিল সে দিন। দেশের মানুষের আর্থিক দুরবস্থা ও সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কে শেখ মুজিব বালক বয়স থেকেই সচেতন ছিলেন এবং তার বিভিন্ন কর্মকাÐে তা প্রকাশও পেয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তান শাসক শ্রেণির বৈষম্য-নীতি, শোষণ ও অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামের কথাই বারবার ঘুরে ফিরে আসে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। তখন থেকেই তিনি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বাঙালি জীবনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালির জন্য ভেবেছেন কোনো শ্রেণি, সংগঠন, পেশা বা কোনো গোষ্ঠীর কথা আলাদা করে ভাবেননি। কিন্তু এসব সামাজিক আর্থিক অবস্থানের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সমস্যাগুলোকে তার কর্মে ও ভাবনায় তিনি স্থান দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বাংলাদেশের ঐশ্বর্য সম্পদ, বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকদের কথা উল্লেখ করে প্রায়ই বলতেন, ‘এ বাংলায় কিনা আছে! বাংলা কবির দেশ কবিতার দেশ, বাংলা বিপ্লবীর দেশ বিপ্লবের দেশ, বাংলা ভাবুকের দেশ ভাবনার দেশ, বাংলা শিল্পীর দেশ শিল্পের দেশ, বাংলা সোনার দেশ, রুপার দেশ, বাংলা ঐতিহ্যের দেশ ইতিহাসের দেশ।’
বঙ্গবন্ধুর ভাবনা জুড়ে ছিল হাজার বছরের বাংলাদেশ। তার সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখার ইতিকথা কেবল পাকিস্তান আমলে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের যুগের নয়, তারও আগের। শেখ মুজিব সর্বভারতীয় অপেক্ষা বাংলার রাজনীতি, বাংলার জন্য নিয়ে বেশি ভাবতেন, বাংলার দুঃখী মানুষের কথা তার রাজনৈতিক কর্মে ও ভাবনায় কৈশোর থেকেই স্থান করে নিয়েছিল। তাই শেখ মুজিবের জীবন ও কর্ম তথা রাজনৈতিক ইতিহাসকে বাংলাদেশের মর্মকথার নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস, বাংলাদেশের বহির্জগতের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিত্রিত করা যাবে না। একটি সমাজ, জনজীবন বা জাতির ভাবধারাতে সঠিক স্থান নির্দেশই শুধু ইতিহাসের বিষয়বস্ত নয়, তার বিচার-বিশ্লেষণ ইতিহাসের অন্তর্গত। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ইতিহাস সর্বতোভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক-
সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বঙ্গবন্ধু ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য ধারার উত্তর সাধক বলা যেতে পারে। সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার দৃষ্টান্ত তিনি নিজেই। আশৈশব সংগ্রামী ভ‚মিকায় বাংলার স্বার্থের প্রশ্নে তিনি কখনও কোথাও কোনো আপস করেননি অথবা কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করেননি। এ কারণেই তাকে বারবার কারাবন্দি হতে হয়েছিল।
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত অভ‚তপূর্ব অসহযোগ আন্দোলনের পটভ‚মি ও ব্যাপকতা ভারতে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে কোনো দিক দিয়েই তুলনীয় নয়। স্থান ও কালের ব্যবধান ছাড়াও শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলন একটি সমান্তরাল বেসামরিক সরকার পরিচালনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, যা মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ব্যপ্তি ও প্রভাব থেকে প্রকৃতিগতভাবেই আলাদা।
বাংলাদেশের মানুষ, সংগঠন, রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাড়া দিয়েছে ও অংশগ্রহণ করেছে। এক দিকে সামরিক বাহিনী শত শত লোককে গুলি করে হতাহত করেছে, অপরদিকে বাংলাদেশের মৃত্যুঞ্জয় জনতা বঙ্গবন্ধুর আহবানে শান্তিপূর্ণভাবে অসম সাহসে গুলির মুখে বুক পেতে দিয়ে আন্দোলন করেছে কার্ফ্যু ভেঙেছে জনগণ, তাদের কানে বেজেছিল বঙ্গবন্ধুর অমোঘ নির্দেশনা ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই অসহযোগ আন্দোলনকে সঙ্গতভাবেই বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায় হিসেবে অভিহিত করা যায়। তিন সপ্তাহব্যাপী একটি সমান্তরাল সরকার পরিচালনা করে বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্ব ও সাহসের এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যার উদাহরণ ইতিহাসে নেই। তারপরই শুরু হয়েছিল সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধ বাংলাদেশের অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামে ও দিকনিদের্শনায়। অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধু একজন প্রকৃত জাতীয়তাবাদী নেতায় রূপান্তরিত হন। বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং তার অব্যবহিত আগে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিশেষভাবে মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এবং তার রাজনৈতিক জীবনের পথপ্রদর্শক, সহযোদ্ধা, জাতীয় নেতাদের প্রভাব বঙ্গবন্ধুর জীবনে ছিল। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ বহু নেতাকর্মীর মধ্য থেকে দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা, নিষ্ঠা, লক্ষ্যের প্রতি অবিচল ও একাগ্রতা, সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সাহসের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের অভ্যুদয় ঘটে।
সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দূরদৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি অসাম্প্রদায়িক একটি গণসংগঠন গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু ‘মুসলিম‘ শব্দ বাদ দিয়ে কোনো সংগঠন মুসলিম ছাত্ররা মেনে নিতে পারবে না একথা উপলব্ধি করে শেখ মুজিব বললেন, ‘সংগঠনের নাম হবে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তবে আমাদের কাজের ধারা হবে অসাম্প্রদায়িক।’ এভাবেই মওলানা আবদুুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এদেশের তরুন রাজনীতিক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপের মুসলিম লীগ সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম‘ শব্দ বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠে। শেখ মুজিব এ রূপান্তর করার বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা রেখেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য তরুন যুব নেতা শেখ মুজিব কঠোর পরিশ্রম করেন। দলটি তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কারণে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ‘মনের ওপর জবরদস্তি করা চলে না’ এ কথাটা শেখ মুজিব বলতেন এবং বিশ্বাস করতেন। তিনি কাজের ক্ষেত্রে রোমান্টিকতাকে প্রশ্রয় না দিলেও তার হৃদয় ছিল রোমান্টিক। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বাঙালিকে প্রকৃতির রূপ-রস সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন। বাংলার রূপ-প্রকৃতি, শ্যামল গাছপালা, মাঠে মাঠে সোনার ধান আর গ্রামের শান্ত স্নিগ্ধ জীবন শেখ মুজিবকে এদেশের মাটি ও মানুষকে নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। নদীর স্রোত, দিগন্ত-বিস্তৃত মাঠ তাকে বাংলার মানুষকে ভালোবাসার দীক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলার চাষি, কামার, কুমোর ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ তাকে বিচলিত করত। তাই তার রাজনীতির লক্ষ্য ছিল দেশের অবহেলিত মানুষের মুখে হাসি ফুটানো। এই কাজটি করতে চাওয়ায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলা চলে আড়ম্বরের উচ্চ কোলাহল কখনই তার আত্ম সম্মানকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার মতো পৌরুষ এবং তেজস্বী বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে দুর্লভ।
অহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান। সে দিন গাড়িতে তিনি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টের মিলিটারি সেক্রেটারি তাকে বাধা দিতে উদ্যত হন এবং কিছু মন্তব্য করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কঠোর দৃষ্টির সামনে তিনি নিরস্ত হন, এই তেজস্বিতা তাকেই মানায়। প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে সাহস বিস্তৃত বক্ষপটের অধিকারী এ রকম মানুষ বিশেষ ছিল না। তিনি তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে, আচার-আচরণে স্বাভাবিক বাঙালি চরিত্রের ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং একই সঙ্গে অজস্র মানুষের ভালোবাসা তাকে এই চারিত্রিক দৃঢ়তার অধিকারী করেছে। তিনি নিজের শক্তি সম্পর্কে সচেতন, সংকল্প সাধনে অটল ছিলেন। একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন নিরহঙ্কারী, সহকর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে সচেতন। তার লক্ষ্য ছিল একটাই পাকিস্তানের বাঙালির মুক্তি এবং তাদের মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা স্বসমাজে, স্বদেশে এবং বিদেশিদের চোখে। বাঙালিকে একটি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে তোলা ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। রাজভয়, মৃত্যুভয়, লোকভয় কোনো কিছুই তাঁকে সংকল্পচ্যুত করতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সম্পর্কে গবেষকগণ অনেক সময় বিস্ময়বোধ করেন, যিনি তার রাজনীতি শুরু করেছেন তরুন বয়সে মুসলিম লীগের সংস্পর্শে, তিনি কীভাবে সামন্তবাদী সমাজের চিন্তা-ভাবনা ও ভাবাদর্শ থেকে বেরিয়ে এলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার ওপর কার প্রভাব বেশি ছিল এবং কেন ও কীভাবে দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও দেশের মানুষ সম্পর্কে ভাবনা চিন্তায় তার নিজস্বতা গড়ে উঠলো? শৈশবের বহু ঘটনায় সামাজিক পরিবেশের বহু প্রভাব মানুষের চরিত্র গঠনে সহায়ক হয় এবং শেষ দিন পর্যন্ত জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে। পারিবারিকভাবে তিনি পিতার সংস্পর্শ প্রশ্রয় পেয়েছেন বাল্যকালেই। একবার এলাকার এক কৃষিজীবী মানুষ অজন্মার কারনে খাদ্যাভাবে কষ্ট পায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর ঘরের সঞ্চিত ধান-চাল তাদের মধ্যে বিতরণ করেন। এভাবে পরিবারের নিকট থেকেই তিনি মানুষকে ভালোবাসার, দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছেন। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাকে কোনো তত্তে¡র দরোজায় হাজিরা দিতে হয়নি।
বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে এসেছিলেন দেশের মানুষকে ভালোবেসে। তাই ক্ষমতার লোভ, কিংবা যশ-খ্যাতি সম্পদের উচ্চাভিলাষ তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। দেশ ভাগ হওয়ার আগে ১৯৪২-৪৩ সালে শেখ মুজিব যখন ছাত্র রাজনীতি করতেন তখন তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তার কারণে ওই সময়ই তিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ ও নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগ ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তার মধ্যে ছিল নেতৃত্বের গুণাবলী সাহস ও সাংগঠনিক দক্ষতা। লক্ষ্য অজর্নে অবিচল। দেশের মানুষ এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন বলে বিভাগপূর্ব বাংলায় ৫০-এর মম্বন্তরের সময় কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সঙ্গে মুসলিম লীগের যুব কর্মীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে তিনি দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটিতে যোগদান করেন। এ সময় দুর্গতদের মধ্যে সেবাকার্য পরিচালনায় শেখ মুজিবের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
দেশ বিভাগের আগে ১৯৪৬ সালে কলকাতায় ১৬ আগস্ট ব্যাপক রক্তক্ষয়ী হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। যেখানে শেখ মুজিব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে রক্ষার কাজে সারা দিন রাত ঝুঁকি নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। মানুষ হিসেবে শেখ মুজিবের মহত্ত এখানে যে, বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য তিনি নিরন্তর লড়াই করেছেন। তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন খেয়ে পরে সুখে-শান্তিতে বাঁচতে পারে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশে^র দরবারে নিজেদের ন্যায্য স্থান পেতে পারে। আর এ জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর সমগ্র জীবন, চিন্তাভাবনা ও শ্রম উৎসর্গ করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন আদর্শবাদী ও নীতিবান মানুষ হিসেবে এদেশের সাধারণ মানুষের একান্ত কাছাকাছি ছিলেন।
২৪ বছরের নিরসল সাধনায় সাফল্য অর্জন সত্তে¡ও তিনি অহংকারী ও উদ্ধত ছিলেন না। বিলাসিতা ও স্বেচ্ছাচারকে তিনি ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে কখনও প্রশ্রয় দেননি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসাটি একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই আড়ম্বরহীন, বাহুল্যবর্জিত, সাধারণ ছিল। পৃথিবীর কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এতটা সাধারণ, জাঁকজমকহীন এমন কল্পনা করা যায় না। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হিসেবে তিনি অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তার স্ত্রীও তারই আদর্শের অনুসারী ছিলেন। বলা যেতে পারে তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা একজন আদর্শ গৃহিণী হলেও প্রখর রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন মহিলা ছিলেন। কোনোরূপ দাম্ভিকতা, আড়ম্বরপ্রিয়তা ও অহংকারকে মুজিব-দম্পতি প্রশ্রয় দেননি। বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই নির্দ্বিধায় বলা সম্ভব হয়েছে সমগ্র দেশবাসীকে, এদেশের প্রতিটি বাঙালিকে, প্রতিটি মানুষকে ‘আমি তোমাদেরই লোক।’ বিশ্ব কবির এ ঐকান্তিক ইচ্ছার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক, বাংলাদেশের রূপকার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে।
দেশবাসীর ওপর তাঁর প্রভাব ছিল অমোচনীয়। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ একদিন তাঁর কথায় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে। কারণ তারা জানত এ মানুষটি দেশের মানুষের ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই চান না। না পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব, না প্রভুত্বের গৌরব, না ধনৈ ঐশ্বর্যের মূঢ়তার সাহচর্য। বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গৌরব ছাড়া তার আর কোনো স্বপ্ন ছিল না।
বারবার জেলে নিয়ে নিগ্রহ করার পাশাপাশি তাকে হত্যার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। আগরতলা মামলায় দেশদ্রোহী বলে তার প্রাণনাশ করার চেষ্টা করেছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। রাওয়াল পিন্ডিতে আইয়ুবের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার আরও একটি ষড়যন্ত্র হয়েছিল এপিপি প্রধান সৈয়দ মেয়াজ্জেম আলীর বাসায় নৈশভোজের মাধ্যমে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু ভারত সফরকালে কলকাতা প্যারেড গ্রাউন্ডে একজন সশস্ত্র বাংলাদেশ নাগরিক ধরা পড়ে। বঙ্গবন্ধু আলজিরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বলেছিলেন ‘পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতদের পক্ষে।’ স্বাভাবিকভাবেই তিনি আন্তর্জাতিক শোষক চক্র পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন। ধর্মকে রাজনৈতিক ব্যবসায়ে পরিণত না করে ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার জন্য ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতিকে সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি করেছিলেন তিনি। এই উপমহাদেশে ধর্ম ও রাজনীতিকে পৃথকভাবে চর্চার তিনিই পথপ্রদর্শক। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে নয়া আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। উল্লেখ্য, তিনিই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। একই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বিশ্ব শান্তির সংগ্রামে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন।
বাঙালির হৃদয়ে অকৃত্রিম বন্ধুত্ব-ভালোবাসা মুজিব নেতৃত্বের দুর্জয় দুর্গ, যার ভিত্তি বঙ্গবন্ধুর আজীবন নিঃস্বার্থ ত্যাগের ওপর রচিত। বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য তিনি সুদীর্ঘ এক যুগ কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার কক্ষে। মানুষের মুক্তির ইতিহাসে এমন ত্যাগের দৃষ্টান্ত বিরল। মানুষের মুক্তি সংগ্রামে নির্ভীক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তার অনন্য সাধারণ অবদান ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই ইতিহাস তার কাছে ঋণী। বঙ্গবন্ধুর অকুতোভয় নেত্বত্বে অনেক রক্তের মূল্যে বাঙালি আজ মুক্ত। তাঁর ত্যাগ, বন্ধুত্ব ও নেতৃত্ব বাঙালির অমূল্য সম্পদ। এ মহাসম্পদের কল্যাণে মুক্ত বাংলাদেশ অবশ্যই প্রগতির পথে এগোতে থাকবে।
বাংলাদেশকে স্বাধীন করাই বঙ্গবন্ধুর একমাত্র কৃতিত্ব নয়। সাম্প্রদায়িকতার অন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে, শতাব্দী লালিত মূঢ়তা থেকে গণতন্ত্রের মুক্তির মন্ত্র শোনা গিয়েছিল তার কণ্ঠে এবং তা বাস্তবায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয় হয়ে আছেন বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসায়। কোনো কুটকৌশল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে পারবে না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। বঙ্গবন্ধুই বিম্বের একমাত্র নেতা যিনি একটি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে তার যে অন্যতম বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাধান্য পায় তা হলো সর্বোচ্চ ত্যাগ, প্রশ্নাতীত সততা, দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সাহস, মানবতাবাদী এবং লক্ষ্যে অবিচল।
বঙ্গবন্ধু বারবার বলেছেন সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। আমরা অহরহ বলি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। বঙ্গবন্ধুর কথা শুধু মুখে মুখে বললে হবে না তার যে সোনালি আদর্শগুলো রয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে তাহলেই সোনার মানুষ হওয়া যাবে এবং কেবল তখনই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী দাবি করি এখন একটু মিলিয়ে দেখা দরকার এই মহান নেতার আদর্শের কতটা কাছে বা কতটা দূরে আছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক দাবি করলে তাঁর ত্যাগ, সততা আর দেশপ্রেমের মহান আদর্শগুলো অনুসরণ করার চ্যালেঞ্জ তো আমাদের নিতেই হবে। কঠোরভাবে সুশাসন বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি দমন না করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।
