সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির মিলনায়তনে দেশের ৩৯টি জেলার দুই শতাধিক প্রতিযোগী নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ন্যাশনাল নিউজ পেপার অলিম্পিয়াড’। অলিম্পিয়াড নিয়ে
নিউজ টাঙ্গাইলের সাথে কথা বলে সংবাদপত্র অলিম্পিয়াডের স্বপ্নদ্রষ্টা, রংপুর জিলা সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এহসানুল মাহবুব লাব্বী। সাক্ষাৎকার নিয়েছে শেখ নাসির উদ্দিন।

নিউজ টাঙ্গাইল : কেমন আছো ?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?
নিউজ টাঙ্গাইল : জ্বি আমিও ভালো?
নিউজ টাঙ্গাইল : সংবাদপত্র অলিম্পিয়াড এদেশে প্রথম বার আয়োজন হলো। পরিকল্পনা কিভাবে মাথায় আসলে?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : আসলে পরিকল্পনাটা অনেকটা ঠাট্টাচ্ছলে শুরু হয়েছিল। আমরা কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম লেখক আনিসুল হক ভাইয়ের সাথে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের অলিম্পিয়াড নিয়ে কথা চলছিল। হঠাৎ পত্রিকার কথা আসলে আনিসুল হক বলেন তোমরা তো কতই আয়োজন করলে কিন্তু পত্রিকা পড় ? সেই থেকে মাথায় আসলো পত্রিকা নিয়ে কিছু করা যায় কিনা। সেদিন বাসায় ফিরেই পত্রিকা নিয়ে কিছু করার ইচ্ছে হয়। এভাবেই অলিম্পিয়াডে পরিকল্পনাটা আসে।
নিউজ টাঙ্গাইল : অলিম্পিয়াড শুরু করার সময় তোমার কি কখনো মনে হয়েছিল, ঠিকভাবে শেষ করতে পারব তো?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : আসলে সেভাবে চিন্তা করে শুরু করিনি। আমিও তেমন পত্রিকা পড়তাম না। আমার ইচ্ছে ছিলো অলিম্পিয়াড এর কাজে দেশের সব বিভাগ ঘুরব। ঠিকভাবে শেষ করতে পারব কি না সে চিন্তা মাথায় এসেছিল সব সিলেকশন রাউন্ড শেষ করার পর। কারণ তখন পর্যন্ত কোনো স্পন্সর পাইনি। তবে আত্নবিশ্বাস ছিলো যে আমি ঠিকভাবে শেষ করতে পারব।
নিউজ টাঙ্গাইল: তারপর কিভাবে অলিম্পিয়াডের জন্য কাজ শুরু করলে?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : একশত বিশ টাকা নিয়ে অলিম্পিয়াড এর কাজ শুরু করেছিলাম। প্রথমে শুধু কিছু ফরম ছাপাই তারপর জাতীয় পত্রিকা অলিম্পিয়াড নামে একটা অলিম্পিয়াড শুরু হতে যাচ্ছে আগ্রহীরা জানাও। বলে ফেসবুকে একটা পোস্ট দেই। অনেক ভালো সাড়া পেয়েছিলাম। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১০০জন যুক্ত হয়েছিল।
নিউজ টাঙ্গাইল : অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারীদের কাজটা কি ছিলো?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : অলিম্পিয়াড এ কোনো বয়স ছিলো না। আসলে পত্রিকা পাঠের তো কোনো বয়স নেই। যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের দেশের সব জাতীয় দৈনিক পড়তে হয়েছিল। তারপর সেখানে থেকে বহুনির্বাচনি ও রচনামূলক প্রশ্ন ছিল। পাশাপাশি ছিল সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি, প্রেস টক, কুইজ সহ আরো আয়োজন তবে জাতীয় রাউন্ডের প্রশ্ন ছিলো সবচেয়ে আলাদা।
নিউজ টাঙ্গাইল : অংশগ্রহণকারীদের আগ্রহ কেমন দেখা গেছে ?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : নতুন হিসাবে আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ওদের মধ্যেও যথেষ্ট আগ্রহ দেখা গেছে।
নিউজ টাঙ্গাইল : সারাদেশে সিলেকশন রাউন্ড শেষ করে। জাতীয় পর্যায়ে প্রোগ্রাম শেষ করাটা মোটেও সহজ ছিলো না?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : সারাদেশে সিলেকশন রাউন্ড শেষ করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জের ছিলো। কারণ আমি কাউকেই চিনতাম না। তবে আল্লাহর রহমতে ভালোভাবে শেষ করি তারপর জাতীয় রাউন্ড অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো।অলিম্পিয়াড এর এক সপ্তাহ আগেও চিন্তিত ছিলাম জাতীয় রাউন্ড সময়মতো করতে পারব কিনা কারণ তখন পর্যন্ত স্পন্সর পাইনি। অবশেষে স্পন্সর পাই আর আমার টিমের এক সপ্তাহের কঠোর পরিশ্রমে ন্যাশনাল রাউন্ড শেষ করি।
নিউজ টাঙ্গাইল : জাতীয় পর্যায়ে তুমি অলিম্পিয়াড শেষ করেছা। এ কাজে তোমার পূর্বের কোন অভিজ্ঞতা কি কাজে লেগেছে?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : আসলে অনেকদিন আগে থেকেই ভেবেছি জাতীয় পর্যায়ে কোন আয়োজন করব। আর তা অবশ্যই বড় পরিসরে। আমি এর আগে জাতীয় অনেক প্রোগ্রামে ভলান্টিয়ার থাকার অভিজ্ঞতা ছিল। যা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। তবে জাতীয় কোনো আয়োজনে নেতৃত্ব এই প্রথম।
নিউজ টাঙ্গাইল : নিশ্চয়ই বিশাল একটা কর্মী বাহিনী আছে সেটা তৈরি হলো কিভাবে?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : আসলে এখানে তিন গোয়েন্দার ভুত থেকে ভূতে টেকনিক কাজে লাগিয়েছি। প্রথমেই আমার পোস্ট এর মাধ্যমে ঢাকার কিছু ছাত্র-ছাত্রী ক্যাম্পাস এম্বাসেডর হওয়ার জন্য আবেদন করে। তারা যুক্ত হওয়ার পর তাদের হাত ধরে বাকি বিভাগের কিছু ছেলে-মেয়ে যুক্ত হয়। এছাড়া অলিম্পিয়াড গুলোতে কাজ করার সুবাদে অনেক বিভাগেই আমার পরিচিত ছিলো। ওরাও বাকিদেরকে নিয়ে অলিম্পিয়াড এ যোগ দিয়েছে। এভাবে এখন অলিম্পিয়াড এর ক্যাম্পাস এম্বাসেডর ৮৫০জনের উপরে।
নিউজ টাঙ্গাইল : অলিম্পিয়াডে কাজ করা কর্মীদের সাথে সমন্বয় কিভাবে করছ?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : এতবড় টিম সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয়। তবে আমাদের একটা কেন্দ্রীয় কমিটি আছে।কেন্দ্রীয় কমিটি সারাদেশের ৮বিভাগে গঠিত সাব কমিটি গুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করে। সাব কমিটি আবার জেলা ও উপজেলার টিমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।
নিউজ টাঙ্গাইল : সামনে থেকে প্রথম নেতৃত্ব দিয়েছ। তোমার অভিজ্ঞতা কেমন ?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : এই যাত্রাটা সহজ ছিল না। এই অভিজ্ঞতাটা অনেক রোমাঞ্চকর। আমার অলিম্পিয়াড এ অনেক সিনিয়র মানুষ কাজ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইয়া আপুরা ছাড়াও চাকরিজীবী ও অন্যান্যরাও। তারা সবসময় আমাকে সাপোর্ট দেয়। এক্ষেত্রে জুনিয়র হলেও আমার নেতৃত্বে কাজ করতে তাদের কোনো অসুবিধা হয়নি।
নিউজ টাঙ্গাইল : সংবাদপত্র পাঠ কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে তুমি মনে করো?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : সংবাদপত্র একটা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বা দর্পণ। শুধুমাত্র সংবাদপত্রই একটা দেশকে রাতারাতি পরিবর্তন করে দিতে পারে। অন্য যতই ডিজিটাল মিডিয়া থাকুক না কেনো সংবাদপত্র আলাদা গুরুত্ব বহন করে। আর পত্রিকা পাঠের আলাদা একটা মজা আছে। সব ধরনের খবরই একসাথে পাওয়া যায়। তাই পত্রিকা পাঠ অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজ টাঙ্গাইল : সংবাদপত্র অলিম্পিয়াড নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা জানতে চাই।
এহসানুল মাহবুব লাব্বী :জাতীয় পর্যায়ে শেষ হওয়ার পর এবার আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে চাই। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ আমাদের অলিম্পিয়াড এর সাথে যুক্ত হচ্ছে। আমার ইচ্ছে আন্তর্জাতিক সিলেকশন রাউন্ড করার। এছাড়া আমরা নিউজপিডিয়া নামে আমাদের অলিম্পিয়াড এর নিজস্ব একটা বই বের করবো। আমরা বাংলাদেশের ৬৪ জেলাতেই সিলেকশন রাউন্ড করতে চাই।দ্বিতীয় সিজনে আমরা ৪০ টি জেলায় সিলেকশন রাউন্ড করার পরিকল্পনা করেছি।
নিউজ টাঙ্গাইল : তুমি তো দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আর কয়েক মাস পরেই তো পরীক্ষা।
পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি আসলে এত বড় একটা কাজ কিভাবে সম্ভব হলো?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : পড়াশোনার চাপ তো অনেক। কিন্তু এসব আয়োজন আমাকে অনেক টানে।ছোটবেলা অর্থাৎ ক্লাস ফাইভ থেকেই আমি বিভিন্ন অলিম্পিয়াড এ কাজ করি। তাই সহজে ছাড়তে পারি নাই । লেখা পড়ার মধ্যে দিয়েই চালিয়ে যেতে হয়। রাতে এক্সট্রা সময় দিয়ে পড়া কভার করতে হয়।আর আমার টিম আমাকে অনেক সাপোর্ট দেয়। পরীক্ষা গুলোর আগে আমার ডেপুটি সমন্বয় করে।
নিউজ টাঙ্গাইল : তোমার নিজের সম্পর্কে কিছু জানতে চাই ।
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : আচ্ছা। আমি থাকি রংপুরে। রংপুর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেছি।এখন রংপুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির
বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। আমরা দুই ভাই। আমিই বড়।বাবা পুলিশ অফিসার। মা আগে শিক্ষকতা করতেন এখন গৃহিনী। কো কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস আমার অনেক ভালো লাগে।পঞ্চম শ্রেণীতে আঞ্চলিক গনিত অলিম্পিয়াড এ রানার আপ হওয়ার পর থেকেই এসব কাজে আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়।পুরস্কার সংখ্যা শতের ঘর স্পর্শ করেছে।আমার ইচ্ছে মহাকাশ বিজ্ঞানে পড়াশোনা করার।বড় হয়ে মহাকাশ গবেষক হতে চাই!
নিউজ টাঙ্গাইল : তোমার কাজকে পরিবার ও বাহিরের মানুষ কিভাবে দেখে?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : হ্যাঁ। এটা ঠিক। পরিবার অনেক বিরক্ত হলেও আমার ভাল কাজে সবসময় পাশে থাকে।সবচেয়ে সাপোর্ট দেয় আমার মা।স্কুল কলেজের স্যাররাও সাপোর্ট দেয়।তবে কেউ কেউ তো ব্যাতিক্রম থাকেই। অনেকের এসব কাজ ভালো লাগে না।
নিউজ টাঙ্গাইল : সফল হতে হলে কোন জিনিসটা একজন মানুষের ভেতরে থাকা চাই?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী :একটা বিষয় সবাইকে জানাতে চাই নিউজ টাঙ্গাইলের মাধ্যমে। যে যাই বলুক থেমে থাকা যাবে না। একদিন সময় আসবেই এর মাঝে অনেক হোচট খাবে।কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। কারণ জীবনের সফলতা শেষ বয়সেও আসতে পারে। সফল হতে হলে তাকে অবশ্যই আলাদা চিন্তাধারার অধিকারী হতে হবে।যারা একটু ব্যাতিক্রম চিন্তা করে তারাই সফল হয়। এক্ষেত্রে একটা কথা বলে রাখা ভালো। পৃথিবীতে গানের যেমন শেষ হবে না।তেমনি আইডিয়াও শেষ হবে না।
নিউজ টাঙ্গাইল : তোমার মত তরুণদের উদ্দেশ্য করে কি বলার আছে?
এহসানুল মাহবুব লাব্বী : সবসময় বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। নিজের সক্ষমতা জেনে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। আর সব কাজের ক্ষেত্রে উদ্যোগটা নেয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। বাস্তবায়ন করতে তেমন বেগ পেতে হয় না।তাই স্বপ্ন দেখা কখনো থামানো যাবে না।
নিউজ টাঙ্গাইল : তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। নিউজ টাঙ্গাইলের পক্ষ থেকে তোমার জন্য রইল শুভকামনা।
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।