নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: অবশেষে প্রবাস জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে হাঁস পালনে ভাগ্য ফেরালেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ফাজিলহাটী ইউনিয়নের গাছপাড়া কামান্না গ্রামের আমিনুর রহমান । কয়েক বছর আগে তিনি বেশি উর্পাজনের আশায় জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে কাজের সন্ধানে সৌদিআরব এবং সিঙ্গাপুর প্রবাসে বেশ সময় ধরে ঘুরে বেড়িয়েছেন । সেখানে কষ্ট করেও কাঙ্খিত উর্পাজন হয়নি ।
বিদেশ থেকেই তিনি মনে পরিকল্পনা করেছেন বাংলাদেশে ফিরে হাঁস পালন করবেন । যেমনটি ভেবেছিলেন দেশে এসেই কিছু দিনের মধ্যেই বিলের পানিতে শুরু করেন হাঁস পালন । সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার ফাজিলহাটি ইউনিয়নের গাছপাড়া কামারনঁওগা বিলের মাঝে আমিনুর গড়ে তুলেছে একটি হাঁসের খামাড় । হাঁসের পাক্ পাক্ শব্দে যেন মুখরিত বিল জুড়ে । হাঁসগুলো পাহাড় দেওয়ার জন্য রয়েছে একটি ঝুঁপড়ি ঘর । ঘরটি থেকেই হাঁসগুলোর প্রতি খেয়াল রাখেন তিনি । শুধু খাবারের সময় হলে আয় আয় শব্দে হাঁসগুলোকে কাছে ডেকে নিয়ে আসে । তবে বিলে পানি স্থায়ী না হওয়ায় হাঁসগুলো নিয়ে একটু বাড়তি শ্রম দিতে হয় তার । সড়িয়ে নিতে হয় অন্য আরেকটি বিলে । বর্তমানে ভ্রাম্যমান খামাড় হিসেবে গড়েছে তিনি ।
আমিনুর রহমান জানান, তিনি প্রায় ১০/১২ বছর আগে গমের ব্যবসা করতেন । তার গমের ব্যবসার প্রতিদিনের লাভের অংশ থেকে একটি করে হাঁস কিনতেন। এভাবে ১শ ৬৫টি হাঁস কিনলেন। হাঁস পালোনের লাভ তখন থেকেই বুঝতেন। দীর্ঘদিন হাঁস পালনের টাকায় সংসার চালিয়ে বিদেশে যাওয়ার খরচও জোগাড় করেছিলেন। উপার্জন বাড়াতে সৌদি আরবে যান তিনি। সৌদি থেকে ফিরে সিঙ্গাপুরে যান। প্রবাসের চেয়ে হাঁস পালনেই বেশি উপার্জন হবে ভেবে দেশে ফিরে আসেন তিনি। ক’দিন পরই ৩৫ হাজার টাকায় একহাজার জিনডিং ও খাকী ক্যাম্পবেল প্রজাতির হাঁসের বাচ্চা কেনেন । ঘর তৈরিতেও তেমন খরচ হয়নি।
বিলের মাঝে খামার হওয়ায় সবসময় হাঁসগুলো থাকে জলাশয়ে। ফলে খাবার খরচও কমে আসে। বাচ্চাগুলো প্রথম তিন-চার মাস পালনের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩শ ডিম দিচ্ছে। প্রতি শতক ডিম ১১শ টাকা (৪৪টাকা প্রতি হালি) দরে খামার থেকেই কিনে নিচ্ছে পাইকাররা। এতে প্রতি দিনের সাড়ে তিনশ’ ডিম বিক্রি হয় ৩৮শ টাকা । যা মাসে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ৫ মাস যাবত ধারাবাহিকভাবে সাড়ে তিনশ’ ডিম তুলছেন আমিনুর। কখনও খামার মাসে থেকে ৪শ’ ডিমও আসে।
আমিনুর রহমান আরও বলেন, জলাশয়ে ঠিকমতো পানি থাকলে খাবার খরচ কমে যেতো এতে ডিমের দাম আরও কম হত। কিস্তু পানি কমে যাওয়ায় অনেকটা সময় হাঁসগুলো বাড়িতে পালন করতে হয়। এরপরও তার ইচ্ছে চলতি বছরে ৩হাজার বাচ্চা তার খামারে তুলবেন। বিদেশের চেয়েও এখন তার বেশি উপার্জন হচ্ছে। পাশ্ববর্তী অনেকে প্রেরণা পেয়ে খামার করার কথা ভাবছেন। ৪/৫ মাসে খামারের ডিম বিক্রি হয়েছে ৫ লাখ টাকা। খরচ হয়েছে দুই লাখ টাকা। এখন নিয়মিত ডিম দিচ্ছে। এছাড়া একহাজার হাঁসের দাম ৪শ টাকা দরে হলে বিক্রি হবে প্রায় ৪ লাখ টাকা। যার সবটুকুই থাকবে লাভ থেকে। এ হিসেবে মাসে লাখের ওপর উপার্জন হচ্ছে আমিনুরের।তিনি বেকারগ্রস্থদের বলেন, হতাশার কিছু নেই। সঠিকভাবে শ্রম দিলে হাঁস পালনে বিদেশী টাকার চেয়েও বেশি উপার্জন করা সম্ভব। অনেকেই তাকে দেখে হাঁস পালনের পরামর্শ নিতে আসেন। তবে অভিযোগ করে বলেন, প্রাণী সম্পদ বিভাগ এসব খামার পরিদর্শণ, বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরহ, নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিলে খামারিরা উপকৃত হতো। হাঁস পালন একটি লাভজনক প্রজেক্ট। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খাতকে একটি সম্ভাবনাময় খাতে রুপ দেওয়া সম্ভব।
আমিনুরের স্ত্রী বিপুল জানান, তিনি এবং তার স্বামী দুজনে মিলেই শ্রম দিচ্ছে খামারে। ফলে স্বামী প্রবাসে থাকার চেয়ে তাদের সংসার এখন আরও ভালো চলছে। হাঁসের বিষয়ে তিনি বলেন, উপজেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় প্রথম ধাপে ১৭ দিন দ্বিতীয় ধাপে ২১দিন প্রশিক্ষণ করেছেন তিনি। খামারে প্রাথমিক চিকিৎসা এখন নিজেই দিতে পারেন। ডিম দেওয়ার সময় হাঁসের রোগ কম হয়। তবে এসময় ক্যালসিয়াম কমে যায় এটাও বিপুলের জানা। ডিম দেয়া শুরু করলে হাঁকে পিএল দিয়ে দেয়। ফলে চিকিৎসা খরচ অনেকটাই কমে এসেছে। গম ভাঙা, কুঁড়া আর ধান একত্র করে হাঁসের খাবার তৈরি করা হয়। বাজার থেকে কেনা কোন খাবার (ফিড) তাদের খামারে দেওয়া হয় না। সাড়ে তিনমাস বয়স থেকে ডিম দেওয়ার শুরু করে এখনও পালাক্রমে ডিম দিচ্ছে । হাঁস পালনেই মাসে লাখ টাকা উপার্জন করছে। কখনও মাসে এক লাখ আবার কোন ১ লাখ ৩৫/৪০ হাজার টাকার ডিম বিক্রি হচ্ছে।
দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগের ভ্যাটেরিনারী সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ আলী বলেন,আমিনুরের হাঁসের খামরটি নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। তবে হাঁসগুলোকে সুস্থ রাখার জন্য নিয়ম মাফিক ভ্যাকসিন এবং ডাক কলেরার টিকা সিডিউল অনুযায়ী দিতে হবে। সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ভ্যাকসিনসহ, চিকিৎসা ও পরামর্শ সেবা দেওয়া হচ্ছে।
