নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: করোনাভাইরাস একদিকে যেমন কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ , অন্যদিকে বাড়াচ্ছে আর্থিক দীনতা। ফলে মানসিক সঙ্কট তীব্র হচ্ছে। একটি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমীক্ষার তথ্য সে কথাই বলছে।ওই সমীক্ষায় দেখা গেছে, মহামারিকালে ২০২১ সালে সারা দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। শনিবার আঁচল ফাউন্ডেশন ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়েছে আত্মহত্যা : হতাশায় নিমজ্জিত শিক্ষার্থীরা’ শীর্ষক এই গবেষার ফল প্রকাশ করে।
আত্মহত্যার কারণ হিসেবে সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপ বেড়ে যাওয়াকে দুষছেন গবেষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করোনাকালে শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটাবিশ্বেই মানসিক স্বাস্থ্যসঙ্কট দেখা গেছে। নানা কারণে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে। তবে প্রধানত অর্থের দুরবস্থার ফলে সামাজিক ও পারিবারিক বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে অনেকে। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা আইডিয়াল সেলফের সঙ্গে রিয়েল সেলফের যুদ্ধ শুরু করে। এক পর্যায়ে তাদের জীবনকেই নিঃশেষ করতে চায়। এ থেকে উত্তরণে কাউন্সেলিংয়ের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চাইল্ড অ্যাডোলোসেন্ট ও ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, আত্মহত্যা প্রবণতার বড় কারণ বিষন্নতা। সেটা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে হোক কিংবা পরীক্ষায় ফেল করে হোক।
নিউজ টাঙ্গাইলকে তিনি বলেন, আত্মহত্যাকে আমরা এখনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখি। এটাকে ডিক্রিমিনালাইজ করতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতাকে অপরাধ হিসেবে দেখা অত্যন্ত অমানবিক। ক্রিমিনাল অ্যাক্ট সংশোধন করতে হবে। স্কুলে ‘লাইন বাই লাইন’ পড়া ও ক্লাস কমিয়ে আনতে হবে। সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়াতে হবে, তা হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে মনের যত্ন নিতে হবে।
কাউন্সেলিংয়ের বিকল্প নেই। বাংলাদেশে করোনাকালে আর্থিক অসচ্ছলতার চিত্র প্রকট উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের চেয়ারপারসন শান্তা তাওহিদা বলেন, এই ধরুন প্রত্যন্ত গ্রামের একজন ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় অনেক স্বপ্ন নিয়ে। তাদের ওপর পরিবারের একটি দায়িত্ব থাকে। কিন্তু এই করোনা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেতন বন্ধ হয়েছে। উপরন্তু কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। এসব দেখে হতাশ চারকরিপ্রার্থী শিক্ষার্থী। সে সঙ্গে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অনেকদিন তারা মনখুলে কথা বলতে পারেনি। ক্যাম্পাসের আবহ থেকে বঞ্চিত ছিল। অর্থাৎ বন্ধুদের মনের জানালা বন্ধ ছিল। তার মতে, শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিংয়ের বিকল্প নেই। সেটা পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠান থেকে হতে পারে।
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী এবং চাইল্ড সাইকোলজিস্ট জাহান আরা বলেন, হুট করেই শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায় না। এই করোনাকালে তারা সবচেয়ে বেশি অনিরাপত্তায় ভুগেছে। নিজেকে হীনমন্য মনে হয়েছে। নিজের মধ্যে নিজে যুদ্ধ করেছে। অর্থাৎ আইডিয়াল সেলফের সঙ্গে রিয়েল সেলফের দ্বন্দ্ব বেড়েছে। এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, কোভিডে বহু শিক্ষার্থীর মা-বাবার চাকরি চলে গেছে। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি বাবা কিংবা পরিবারের অন্য কেউ মারা গেছে। কিংবা একাধিক প্রিয়জনকে হারিয়েছে।
শিক্ষার্থীরাও তাদের টিউশনি হারিয়েছে। এসব কারণে এই সঙ্কটকালে তাদের জীবনকে ব্যর্থ মনে হয়েছে। তাদের কাছে মনে হয়েছে করোনা যেহেতু স্বপ্নের মৃত্যু ঘটিয়েছে, তাই জীবন রেখে কী লাভ? তিনি বলেন, আরেকটি পরিতাপের বিষয় হলো, সঙ্কটের সময় পরিবার ও সমাজ থেকে নানাভাবে বুলিংয়ের শিকার হতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটছে। এগুলো থেকে পরিত্রাণ পেতে পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন সাইকোলজিস্ট জাহান আরা।
আঁচল ফাউন্ডেশনের কার্যনির্বাহী সদস্য ফারজানা আক্তার বীথি জানান, অর্ধশতাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার তথ্য এবং আত্মহত্যায় জড়িতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা এবারই বেশি বলে দাবি করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে অনুসন্ধান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যার সংখ্যা ৯। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যাটি ৬, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীরা, যাদের সংখ্যা ৩ জন।
আঁচল ফাউন্ডেশনের গবেষণার সঙ্গে খানিকটা দ্বিমত পোষণ করে ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি আত্মহত্যা হচ্ছে আর বেসরকারিতে কম এমনটি বলা যাবে না। আর ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোভিডে আত্মহত্যা বেড়েছে। কিন্তু আগে যে কম ছিল তারও পরিসংখ্যান নেই। মডেল ও অভিনেত্রী ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর আত্মহত্যা প্রতিরোধে সোশ্যাল ক্যাম্পেইন, মেন্টাল হেলথ ক্লাব প্রতিষ্ঠা ও খেলাধুলা বাড়ানোর কথা বলেন।
