কিশোর গ্যাংয়ের কাছে রয়েছে দেশি অস্ত্রের ছড়াছড়ি, এমনকি অত্যাধুনিক বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র। মুঠোফোন ব্যবহার করে এমনকি ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য ও ছবি আদান-প্রদান করে পরস্পরকে হামলার নির্দেশ দিচ্ছে। যে বয়সে বই নিয়ে কিশোরদের স্কুলে যাওয়ার কথা, ঠিক সেই বয়সে ছুরি, চাকু হাতে কিশোররা হত্যাকাণ্ডসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে।
দেশে শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালনা হচ্ছে ভয়ংকর সব কিশোর গ্যাং
২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরায় একটি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং লোকসমক্ষে আসে। আজ এর ডালপালা গজিয়ে শুধু রাজধানীতে ৭০ থেকে ৭৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সক্রিয়তা দেশে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার জানান দেয়।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে-বন্দরে উঠতি বয়সের ছেলেরা একত্র হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে নানা ধরনের অসামাজিক তৎপরতা। বিভিন্ন নামে এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে তুলেছে কিশোর গ্যাং। কখনো পাড়া, মহল্লায় স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালনা হচ্ছে ভয়ংকর সব কিশোর গ্যাং। আধিপত্য বিস্তার, মাদক সেবন ও বিপণনের স্বার্থে ওদের গ্রুপে গ্রুপে মারামারি খুনাখুনি লেগেই আছে। তারা ঘটাচ্ছে হত্যাকাণ্ডের মতো কর্মকাণ্ড।
শুধু চুরি, ছিনতাই নয়, শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে উঠতি বয়সের কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। কিশোর অপরাধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো সমাজব্যবস্থায়। আকাশ-সংস্কৃতির অবাধ প্রবাহের এ যুগে অশ্লীল ভিডিও, ফেসবুক, ইন্টারনেটের অপব্যবহার তাদের বিপথগামী করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও অস্ত্র বহনের মতো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত কিশোররা কালক্রমে হয়ে পড়ে মাদকসেবী। পারিবারিক, সামাজিক অনুশাসনের অভাবে বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওরা অঢেল অর্থ ব্যয় করে নেশার পেছনে। পরে শত চেষ্টায় এ থেকে আর তাদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না। এর পেছনে কখনো কাজ করে একশ্রেণির শক্তিশালী সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র। নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য কোমলমতি কিশোরদের লাগানো হচ্ছে। ত্রাস হিসেবে তারা যেকোনো ধরনের অপরাধ করে চলেছে।
সারা দেশে কিশোর গ্যাং এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ করতে দ্বিধাবোধ করছে না। এসব কিশোর অপরাধীর বেশিরভাগেরই বয়স যেহেতু ১৮ বছরের নিচে, তাই আইনানুযায়ী তাদের অপরাধকে শাস্তির আওতায় আনা হলেও তা হচ্ছে লঘু। আর এরই সুযোগ নিয়ে তাদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে সুযোগ পাচ্ছে সন্ত্রাসী গ্রুপ। এদের অত্যাচারে অনেক স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ছিন্নমূল পরিবারের কিশোরদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে টানে আনে। সাহসী ও বুদ্ধিমান কিশোরদের চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ছোটখাটো অপরাধের বাইরেও মাদক বিক্রি, অস্ত্র ও বোমা বহনের মতো মারাত্মক কাজে ব্যবহার করা হয়। এ কাজের জন্য ওদের দেওয়া হয় লোভনীয় অঙ্কের অর্থ। অর্থের প্রলোভনে পড়ে কিশোররা একসময় অপরাধ জগতের স্থায়ী সদস্য হয়ে যায়। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিশোরদের একটি বিরাট অংশ নিম্নবিত্তের।
প্রতিকূল পরিবেশে অবহেলা, বঞ্চনা এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে একসময় অপরাধ জগতের অন্ধকারের দিকে পা বাড়ায়। কখনো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে হয়ে ওঠে বেপরোয়া। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত শিশু-কিশোররাই প্রথমে অপরাধ জগতের নবীন সদস্য হয়ে কালক্রমে শীর্ষস্থানে চলে যায়।
নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তের ছাড়াও উচ্চবিত্তের পরিবারের কিশোরদের কখনো ভয়ঙ্কর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। অর্থাভাব যেমন একটি কিশোরকে অপরাধ জগতে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি অর্থের প্রাচুর্যও কখনো অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাবা-মায়ের অসতর্কতার কারণে এসব কিশোর অসৎ সঙ্গে মেশার সুযোগ করে নিচ্ছে। সেবন করছে দামি সিগারেট, গাঁজা এমনকি ইয়াবা। নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার নামে তারা নানা ধরনের অসামাজিক কাজে জড়িয়ে রয়েছে। নেশার ঘোরে ঘটিয়ে চলছে নানা অপরাধ, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ। মা-বাবা, নিকটাত্মীয়কে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করছে না।
পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ শিথিল হয়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, একাকিত্ব, মাদকাসক্তি, অশ্লীল ও সহিংসতানির্ভর ছবি দেখা, আপত্তিকর ভিডিও গেমে আসক্তি, ভিনদেশি কালচারে অভ্যস্ততা এবং হিরোইজম প্রদর্শন কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
আজকাল অর্থবিত্ত নির্বিশেষে মা-বাবা, অভিভাবক কিশোর সন্তানদের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল রাখেন না। পরিবারের প্রায় সবাই জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে এত ব্যস্ত থাকেন যে, ঘরে তাদের সন্তানের দেখভালের যথেষ্ট সময়ই পান না। মোবাইল ফোন আর কম্পিউটার ব্যবহারে ব্যস্ত কিশোর সময় কাটায় এক পরিবার-বিচ্ছিন্ন জগতে।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্থের প্রলোভনে কিশোর-তরুণদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফায়দা লুটতে ব্যবহার করা হয় কিশোর গ্যাং। পর্দার আড়ালে থেকে যারা এসব কাজ করেন তারা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর গ্যাংয়ের অপরাধী কিশোরদের কখনো অপরাধ জগতের পঙ্কিল পথ ছেড়ে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো অকালে জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে হয়তো একসময় এর পরিসমাপ্তি ঘটে। আর এর খেসারত দিতে হয় পরিবারকে। পুরো সমাজে পড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব।
কিশোর অপরাধ দূরীকরণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কিশোর গ্যাং কালচার স্থায়ী ব্যাধি ক্যানসার রূপে ছড়িয়ে পড়বে। কিশোর অপরাধীদের চিহ্নিত গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডাস্থলে পুলিশের নিয়মিত টহল দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। কিশোরদের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
RELATED ARTICLES
