দিনাজপুরের বিরামপুরে বিষাক্ত পদার্থ মেশানো কোমল পানীয় স্পিড পান করিয়ে স্বামীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে নববধূ ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকেলে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন শাহাদৎ হোসেন (২২) নামে ওই যুবক।
নিহত শাহাদৎ হোসেন বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ধনসাডাঙ্গা গ্রামের মো. জাকেরুল ইসলামের ছেলে।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. জাকেরুল ইসলাম ছেলের স্ত্রী তামান্না (১৯), তাঁর বাবা মো. কামাল (৪৫), মা মোছা. সুলতানা (৪২), বোন মোছা. কামরুন্নাহার আশা (২০) এবং হাবিবপুর বাজারের একটি কীটনাশকের দোকানের কর্মচারী মো. মশফিকুর (২২)-এর বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দিয়েছেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর পারিবারিকভাবে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী শাহাদৎ ও তামান্নার বিয়ে হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে তামান্নাকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বিয়ের পর পুত্রবধূকে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার উপহার দেওয়ার কথাও এজাহারে উল্লেখ করেছেন বাদী।
নিহতের বাবার অভিযোগ, বিয়ের পর তামান্নার আচরণে অসংগতি ও স্বামীর প্রতি অনীহা লক্ষ্য করেন পরিবারের সদস্যরা। পরে তাঁরা জানতে পারেন, তামান্নার সঙ্গে মশফিকুর নামের এক যুবকের আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এমনকি তাঁরা আগে বাড়ি থেকে পালিয়েও গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে তামান্নার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করলে তাঁরা আগের ঘটনা ভুলে সংসার চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এ সময় শাহাদৎকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তাঁর বাবা।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ অক্টোবর তামান্নাকে তাঁর বাবার বাড়িতে রেখে আসেন শাহাদৎ। পরে ১১ অক্টোবর স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে শ্বশুরবাড়িতে গেলে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
নিহতের বাবার দাবি, এরপর অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে শাহাদৎকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিষাক্ত পদার্থ মেশানো স্পিডের বোতল তামান্নার হাতে দেন। ওই দিন বিকেল পাঁচটার দিকে স্বামীর সঙ্গে মোটরসাইকেলে বাবার বাড়ি থেকে ফেরার পথে হরিরামপুর মোড় পার হওয়ার পর তামান্না বোতলের মুখ খুলে শাহাদৎকে স্পিড পান করতে বলেন। সরল বিশ্বাসে তিনি তা পান করেন।
কিছুক্ষণ পর পানীয়টির স্বাদ অস্বাভাবিক ও দুর্গন্ধযুক্ত মনে হলে শাহাদৎ বিষয়টি স্ত্রীকে জানান এবং তাঁকেও পান করতে বলেন। তবে তামান্না পান না করে বোতলের মুখ বন্ধ করে রাখেন। পরে বাড়ির কাছাকাছি ধনসা মাঠ এলাকায় পৌঁছালে অবশিষ্ট পানীয় পান করতে বলা হয়। শাহাদৎ অসুস্থ বোধ করায় স্ত্রীকে অবশিষ্ট অংশ পান করতে বললে তিনি কৌশলে বোতলটি ফেলে দেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাড়িতে পৌঁছানোর পর শাহাদৎ বমি ও পাতলা পায়খানা করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে পরদিন তাঁকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এজাহারে বাদী দাবি করেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা শাহাদতের শরীরে প্যারাকোয়াট (Paraquat) বিষক্রিয়া শনাক্ত করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলেও সেখানে ভর্তি করাতে না পেরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুই দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁকে আবার দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার বিকেল চারটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে বিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
