এ পৃথিবীতে যা কিছু কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী আর অর্ধেক তার নর। পৃথিবীর উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ সমান হলেও আমরা তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে আজও কুণ্ঠিত। পদে পদে নারীকে বঞ্চিত করার অসংখ্য উদাহরণ এখনও আমাদের চারপাশে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতা। সম্প্রতি নারী-শিশুর প্রতি যৌন সন্ত্রাসের যে পরিসংখ্যান সংবাদ মাধ্যমে আসছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা। বাদ যাচ্ছে না শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক নারীরাও।
জানা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ১ হাজার ২০৪ নারী ধর্ষণ ও ৭২ নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর গত পাঁচ বছরে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩ হাজার ৯৭২ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮৬ জনকে। পাশবিকতার শিকার এসব নারীর ৮৬ শতাংশ শিশু-কিশোরী। অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে শুধু গত বছরের জানুয়ারি থেকে এ বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৬০৮ নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। কোথাও যেন নারীরা নিরাপদ নয়। না ঘরে, না বাইরে। গণপরিবহনে হয়রানির ঘটনাও নৈমিত্তিক।
উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীর গণপরিবহনে যাতায়াতকালে ৯৪ ভাগ নারীই যৌন হয়রানির শিকার হয়। নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি সহিংসতার যে খন্ডচিত্র প্রদত্ত তথ্যে উঠে এসেছে তা থেকেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুমান করা যায়। এর বাইরেও রয়েছে অনেক ঘটনা। যেগুলো কখনই সংবাদমাধ্যমের সামনে আসে না, যেসব ঘটনা নিয়ে মামলাও হয় না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা উহ্যই থেকে যায়।
উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে আজ আমাদের যে যাত্রা, সেখানে নারীরও রয়েছে সমান অংশগ্রহণ। অথচ আমরা এখনও নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়তে পারিনি। অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের নানা স্তরে নারীরা নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সেসব অপরাধের যথাযথ বিচার ও শাস্তি হচ্ছে খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। এমনকি নির্যাতিত নারীকেও অনেক সময় হেনস্থার শিকার হতে হয়। বিচারপ্রার্থী নারীকেও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে এমন উদাহরণও কম নয়। অথচ আমাদের আইনে রয়েছে ১৮০ দিনের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার বিচার সমাপ্ত করতে হবে। ইতঃপূর্বে বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় যেন কোনো অপরাধী পার পেয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হাইকোর্ট নারী নির্যাতনের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া নারীর প্রতি যেকোনো সহিংসতার ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে ও কঠোর শাস্তির বিধানসহ প্রতিরোধেরও ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে একটি রায় দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত।
জনস্বার্থে করা একটি রিটে ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি দেওয়া এক রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, শুধু পাবলিক প্লেসে নয়, সব ধরনের যানবাহন, বাসাবাড়ি ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যৌন হয়রানির ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। দেশের প্রতিটি সাইবার ক্যাফেতে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে ও যারা ব্যবহার করবে তাদের আইডি কার্ড দেখাতে হবে। অনুমোদন ছাড়া কোনো সাইবার ক্যাফে চলবে না। যৌন হয়রানির বিষয়ে প্রতিটি থানায় একটি আলাদা সেল গঠন করতে হবে, যারা প্রতিমাসে সংশ্লিষ্ট এসপি ও পুলিশ কমিশনারের কাছে রিপোর্ট করবে। ভিকটিম অ্যান্ড উইটনেস প্রটেকশন আইন দ্রুত পাস করতে হবে। এ আইন না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌন হয়রানির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। হাইকোর্টের দেওয়া এসব নির্দেশনার অধিকাংশ এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। আনা হয়নি আইনে পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে এ সংক্রান্ত সংশোধিত আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে ভেটিংয়ের অপেক্ষায়।
শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। একইভাবে নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতাও জঘন্য অপরাধ। এ অপরাধ করে অপরাধীর পার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। তাই নারী নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা যথাযথভাবে পালনের উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে করে অপরাধীর সাজা নিশ্চিত হয়। অপরাধীর সাজা দেখে অন্যরা অপরাধপ্রবণতা থেকে অনুৎসাহিত হয়। আমরা মনে করি, ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সচেতনতা ও জনমত তৈরি করতে হবে। ধর্ষণের বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও বাধাগুলো দূর করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে– আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।
