যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়াই হু হু করে বেড়েই চলেছে নিত্যপণ্যের দাম। যেসব পণ্যের দাম বাড়ার কথা নয়, সেসব পণ্যের দামও বাড়ছে সকাল-বিকাল ব্যবধানে। বাজারে গিয়ে পছন্দের পণ্য চাহিদামতো কিনতে পারছেন না অনেকেই। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি রাখতে গিয়ে জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র না কিনেই ঘরে ফিরছেন কেউ কেউ। এক্ষেত্রে সরকারেরও যেন কিছু করার নেই। শুধু ক্রেতা সাধারণই নয়, সরকারও যেন হয়ে পড়েছে অসহায়।
তাহলে নিত্যপণ্যের বাজার কার নিয়ন্ত্রণে- এমন প্রশ্ন প্রায় সব ক্রেতারই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধিতে দরিদ্র থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই অতিষ্ঠ ও অসহায় হয়ে পড়েছে। অনেকের দিন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। দুঃখের বিষয়, ব্যবসায়ীদের এমন অনৈতিক ও মুনাফালোভী চরিত্র বিশে^র আর কোনো দেশে আছে কি না, তা আমাদের জানা নেই।
এদিকে প্রতিবছরই রোজার সময় যত কাছাকাছি হয়, নিত্যপণ্যের মূল্য তত বাড়তে থাকে। ক্রেতারা বলছেন, রোজা আসার প্রায় তিন মাস আগ থেকেই অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অবৈধভাবে বাড়ায় মজুদ। সৃষ্টি করে কৃত্রিম সঙ্কট। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেভাবে ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তাতে তাদের দুঃশ্চিন্তা করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন নয়। এ দাম বৃদ্ধির যেমন কোনো নিয়মনীতি নেই, তেমনি জবাবদিহির ব্যবস্থাও নেই।
স্বাভাবিক সময়ে তো বটেই বিশেষ কোনো উপলক্ষ এলেই জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের হিড়িক লেগে যায়। বিশেষ করে রমজান ও দুই ঈদ সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। আগে রমজানে ইফতার সামগ্রীসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি একটি অপসংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৌশল বদলে রমজানের আগেই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে যাতে রমজানে দাম বাড়েনি বলতে পারে। এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না।
রমজান শুরু হতে আর মাস দুয়েক বাকি। তার আগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা নানা ছুঁতায় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ কোনো কূল-কিনারা করে উঠতে পারছে না। তারা এক রকম বাজেট নিয়ে গেলে দেখা যায় তা দিয়ে তার চাহিদার পণ্য কিনতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে হয় কোনো পণ্য বাজারের ফর্দ থেকে বাদ দিতে হয়, না হয় চাহিদার তুলনায় কম কিনতে হয়। বিশেষ করে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের কষ্টের কোনো সীমা থাকে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, করোনার কারণে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে, অসংখ্য মানুষের আয় কমেছে। রাজধানী ছেড়ে অনেক পরিবার গ্রামে চলে গেছে। সীমিত আয়ের অনেক মানুষ খরচ কুলাতে না পেরে পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে যারা রয়ে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতিতে তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠছে।
গত এক যুগে পণ্যের বাজারে যা কিছু হয়েছে সেগুলো ভোক্তারা অনেক কষ্টে কোনো না কোনোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হলেও বর্তমানে কিছুতেই পেরে উঠছে না। প্রত্যেক অপরিহার্য পণ্যের দামই হু হু করে বাড়ছে। অন্যদিকে গত দুই বছরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। অনেকে বেকার হয়ে পড়েছে, আবার অনেকের আয়, এমনকি নির্ধারিত বেতন-ভাতাও কমে যাওয়ার নজির সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপকভাবে। যা অতীতে কখনও কল্পনাই করা যেত না। তেমন একটা পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে পণ্যমূল্যের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে। চাকরি চলে যাওয়া বা আয় কমে যাওয়া মধ্যবিত্তের এখন অনেকটা মরণদশা বলা যায়।
এখন আর কোনোভাবেই পারা যাচ্ছে না। সবকারের কার্যকর পদক্ষেপ অতিশয় জরুরি হয়ে পড়েছে। ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থার সংস্কার করা দরকার। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব খর্ব করতে হবে। পাশাপাশি হতদরিদ্ররা যাতে কম দামে পণ্য পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। টিসিবিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রির আওতা ও পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে।
এটা স্পষ্ট হয়েছে, দেশের অসাধু ব্যবসায়ীদের ন্যূনতম দেশাত্মবোধ ও মানবিকতা বলতে কিছু নেই। অর্থলোভই এদের একমাত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। উপদেশে তাদের এই চরিত্র বদল হওয়ার নয়। অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় অসাধুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকারের কঠোর আইনের প্রয়োগ দেখতে চায় জনগণ। সাধারণ জনগণের আশা, শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙাসহ কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা। সরকারের উচিত অবিলম্বে এ বিষয়ে নজর দেওয়া এবং যেসব ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করে ভোক্তাদের শোষণের চেষ্টা করছে তাদের জনসম্মুখে আইনের শাস্তির দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা।
