টাঙ্গাইলের বাসাইলে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তদন্তে নামে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
উপজেলা তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে রডের পরিমাণ ও ঢালাইয়ের পুরুত্বে অনিয়মের পাশাপাশি বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। তবে এলজিইডির ঢাকা অঞ্চলের তদন্ত কমিটি ‘রডের পরিবর্তে বাঁশ’ ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পায়নি।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাঁশ স্ল্যাবের নিচে শাটারিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে একই প্রতিবেদনে সেতুর নির্মাণকাজে স্পেসিফিকেশন না মানা এবং অনুমোদন ছাড়া পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। দুই তদন্ত প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গত সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়।
পরদিন মঙ্গলবার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন ইউএনও। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী রড কম ব্যবহার করার কারণে ঢালাই ও সিমেন্টের খালি ব্যাগের নিচে বাঁশের ফালি অতিরিক্ত সাপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এভাবে বাঁশ ব্যবহার কারিগরিভাবে সঠিক হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্ল্যাব অন্য স্থানে ঢালাই করে সেতুর নির্ধারিত স্থানে স্থাপন করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। স্পেসিফিকেশনে ১০+৫=১৫টি রড থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৪+৪=৮টি। চার ইঞ্চি পুরুত্বের ঢালাইয়ের স্থলে পাওয়া গেছে ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত। কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে ঢালাই করার কথা থাকলেও রাতে ঢালাইয়ের কাজ করা হয়েছে। এছাড়া চোখে দেখে ঢালাইয়ে সিমেন্টের পরিমাণও কম মনে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার এলজিইডির ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মো. ছাদেক প্রধান প্রকৌশলীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘রডের পরিবর্তে বাঁশ’ ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে বাঁশ স্ল্যাবের নিচে শাটারিংয়ের জন্য রাখা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইতোমধ্যে ঢালাই করা স্ল্যাবগুলো র্যান্ডমভাবে পরীক্ষা করে প্রতিটিতে রড পাওয়া গেছে। তবে রডের ব্যবহার স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী হয়নি। ফলে রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ঢালাই করা না হলেও কাজটি নিম্নমানের হয়েছে বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।
এলজিইডির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী প্রি-কাস্ট স্ল্যাব নির্মাণের কথা বলা হলেও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া চুক্তি লঙ্ঘন করে কাস্ট-ইন-সিটু স্ল্যাব ঢালাই করা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কাস্ট-ইন-সিটু পদ্ধতিতে ঢালাই করা স্ল্যাবগুলোতেও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী রড দেওয়া ও ঢালাই করা হয়নি। এ অবস্থায় এসব কাজ সম্পূর্ণ অপসারণ করে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঠিকাদার নিজেই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কাজ করার বিষয়টি তদন্তকারীদের জানিয়েছেন। তাই তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি অভিযুক্ত করা সমীচীন হবে না। তবে প্রকল্পের মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনায় শৈথিল্য ছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে এলজিইডির মনিটরিং ব্যবস্থায় নিয়মিত ঠিকাদারের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা সভা, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পদ্ধতি এবং জেলা পর্যায়ে সিসিটিভির মাধ্যমে অনলাইন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রতিটি কাজ শেষে কোর কাটার টেস্টসহ প্রয়োজনীয় মান যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন জানান, তার দপ্তরের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গ্রামীণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়কে ৯০ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটির নির্মাণকাজ করছে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়
