নিউজ ডেস্ক:”বর্জ্য থেকে যদি ভালো কিছু হয় তবে বর্জ্যই ভালো”। টাঙ্গাইলের মধুপুরে গড়াঞ্চলে কলা গাছের খোসা ও আনারসের পাতা থেকে তৈরি হচ্ছে উৎকৃষ্টমানের সোনালী আঁশ (জুট)।
এসব সোনালী আঁশ নীলফামারী ও ঢাকায় শিল্প কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে কার্পেট, পাপোশ, রশি, ফুলদানীসহ নানা ধরনের সৌখিন ও মূল্যবান তৈজসপত্র। কলা গাছের খোসা ও আনারসের পাতার ফাইবারে তৈরিকৃত সৌখিন জিনিসপত্র দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। সুনাম কুড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে। কলা গাছ ও আনারসের পাতার প্রচুর আধিক্য থাকায় মধুপুর গড় এলাকায় এ শিল্পের সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ব্যক্তি উদ্যোগে মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ি ইউনিয়নের কাকড়াঘুনি গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মজিবর রহমানের ছেলে আনোয়ার হোসেন এ উদ্যোগ গ্রহন করেছেন।
আনোয়ার হোসেন জানান, মধুপুর গড় এলাকা কলা ও আনারস চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এ এলাকায় প্রচুর পরিমাণে কলা ও আনারস চাষ হয়ে থাকে। এ কারণে মধুপুর গড় এলাকাকে কলা-আনারসের রাজধানীও বলা হয়। পর্যাপ্ত কাঁচামালের যোগান থাকায় তার পরিচিত ঢাকার মোকাদ্দেছ নামের এক ব্যবসায়ির পরামর্শে ২০১৬ সালে কলা গাছের খোসা ও আনারসের পাতা থেকে গোল্ডেন ফাইবার (সোনালী আঁশ) উৎপাদনের কাজ শুরু করেন। ওই ব্যবসায়ির মাধ্যমে ঢাকা থেকে ৬ লক্ষ টাকায় ৩টি মেশিন ক্রয় করেন। মেশিনগুলো বাড়ির আঙ্গিনায় বসিয়ে তিনিই প্রথম উৎপাদন কাজ শুরু করেন। নিজ গ্রামেই প্রচুর পরিমাণে কলা গাছের খোসা ও আনারসের পাতা পাওয়া যায়। এ কারণে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে তাকে অন্য কোথাও যেতে হয়নি।
স্থানীয় নারী ও পুরুষ শ্রমিক দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে কলা ও আনারসের বাগান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। শুরুতে মেশিন চালানোর জন্য চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে শ্রমিক নিয়ে আসেন। পর্যায়ক্রমে স্থানীয় শ্রমিকরা মেশিন চালানো রপ্ত করে ফেলেন। এরপর আরও ২টি মেশিন ক্রয় করে তিনি ব্যবসার পরিধি বাড়ান। বর্তমানে ৫টি মেশিন ও ৪০জন নারী-পুরুষ শ্রমিক এ কারখানায় কাজ করেন। প্রতিদিন উৎপাদন হয় সোনালী আঁশ বা তন্তু বা ফাইবার। এভাবে ৫ বছর যাবত তার কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে ফাইবার। প্রতিমাসে শ্রমিক খরচ, পরিবহন যোগাযোগ সব খরচ মিলিয়ে যা ব্যয় তা মিটিয়ে কিছু লাভ পান তা দিয়ে বাড়াচ্ছেন কারখানার পরিধি। চালিয়ে যাচ্ছেন তার কারখানার ফাইবার ব্যবসা।
তার বাড়ির আঙ্গিনায় গড়ে তোলা কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পূর্বপাশে কাকড়াঘুনি বাজারের পাশে গড়ে তুলেছেন এ ফাইবার কারখানা। এসব মেশিন একসাথে বসানো হয়েছে। মেশিন ঘরের উপরে ত্রিফলের ছাউনি। এর নিচে শ্রমিকরা কলা গাছের খোসা ও আনারসের পাতা দিয়ে ফাইবার তৈরি করছেন।
পাশেই মেশিনের ভেজা ফাইবার ধোয়ার জন্য পলিথিন বিছিয়ে গর্তের পানির মধ্যে হাউজ করা হয়েছে। এখানে ফাইবার ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। পাশেই বাঁশের আড় বানানো হয়েছে। যেখানে আঁশ বা ফাইভারগুলো রৌদ্রে শুকানো হয়। মেশিন ঘরের পাশেই টিনের ছাপড়া দিয়ে গুদাম ঘর তৈরি করছেন। গুদামে উৎপাদিত মাল রাখা হয়। কারখানার একপাশে কলার বাগান এবং অপর পাশে ২০ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠা করেছেন তার কারখানা। এ কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরামহীন ভাবে কাজ করেন শ্রমিকরা।
কাকড়াঘুনি গ্রামটি মুলত: গারো অধ্যুষিত একটি গ্রাম। এ গ্রামের অধিকাংশ জনগণ গারো সম্প্রদায়ের। কিছু মুসলিমের বসবাস রয়েছে এ গ্রামে। তারা মিলেমিশে একসাথে বসবাস করে আসছে। এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ শ্রমজীবি। তারা আনারস ও কলার বাগানে দিনমজুরের কাজ করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠঘাটে খেটে খায়। পাশে মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী শালবন। এ বনের উত্তর পাশ ঘেষা এ গ্রামটি। স্থানীয়রা জানালেন, এ গ্রামের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এ মাটিতে আনারস, কলা, পেপে, আদা, হলুদ, আমসহ নানা জাতের কৃষি ফসল উৎপাদন হয়। কলা ও আনারস চাষের সূত্র ধরেই এ কারখানা স্থাপন করেন আনোয়ার হোসেন।
আনোয়ার হোসেন পড়াশুনা করে প্রাইমারী সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। ৫ম শ্রেণির আগেই তার পাঠ চুকিয়ে যায়। পড়াশোনা করতে না পারলেও মেধা ও বুদ্ধিতে তিনি এগিয়ে আছেন। মেধা ও মনন দিয়ে কিভাবে আত্মকর্মসংস্থান ও এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান কিভাবে হবে এ বিষয়ে তিনি ভাল বুঝেন। পরিবার গঠনের ক্ষেত্রেও তিনি তার স্বাক্ষর রেখেছেন। সংসারে ২ ছেলে ১ মেয়ে, ছেলেরা তার কাজে সহযোগিতা করে।
আনোয়ার হোসেন আরও জানান, কারখানায় প্রতিদিন ৫টা মেশিন চললে আঁশের উৎপাদন হয় ৫০ কেজির মত। উৎপাদিত কাঁচা আঁশ ভালভাবে হাউজে ধুয়ার পরে রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর গুদামজাত করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ার কারণে তাদের পরিবহন খরচ একটু বেশি।
পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে তিনি কারখানার পরিধি বাড়াতে পারছেন না। অর্থের সংস্থান পেলে তিনি কারখানার পরিধি বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ও আরো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এজন্য তিনি সরকার ও বেসরকারী বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বড় আকারের কারখানা করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শোলাকুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ ইয়াকুব আলী বলেন, শোলাকুড়ি ইউনিয়নটি আনারস ও কলার জন্য বিখ্যাত। আনোয়ার হোসেন যে কাজটি শুরু করেছেন এটি একটি ভাল উদ্যোগ। এ শিল্পে এ অঞ্চলে কাঁচামালের অভাব নেই। এ এলাকায় এ শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে এই এলাকা আরও এগিয়ে যাবে।
