করোনাভাইরাস সংকটে সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান আর্থিক খাত পোশাক শিল্পে। লকডাউনের কারণে মানুষ যেহেতু বাইরে বের হতে পারছে না তাই পোশাকের চাহিদাও কমেছে। তাই ইউরোপ আমেরিকার ক্রেতারা একাধিক ক্রয়াদেশও বাতিল করেছে। আর ক্রয়াদেশ না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশের একাধিক কারখানা। শিল্প গোয়েন্দা ও পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিসংখ্যানে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে দুই মাস ধরে ছয় শিল্প এলাকায় গড়ে ২ হাজার কারখানা বন্ধ থাকছে। ঢাকার আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে সব খাত মিলিয়ে শিল্প-কারখানা আছে সাড়ে সাত হাজারেরও অধিক। শিল্প কেন্দ্রীভবনের কারণে শিল্প এলাকাগুলোতে পোশাক কারখানার সংখ্যাই বেশি। ছয় শিল্প কারখানায় শুধু পোশাক খাতের কারখানাই আছে ২ হাজার ৮৯৩টি। এ খাতেরই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বস্ত্র শিল্পের কারখানা আছে ৩৮৯টি। এছাড়া বেপজার আওতায়ও আছে বস্ত্র ও পোশাক খাতের কারখানা। সব মিলিয়ে ছয় শিল্প এলাকায় মোট ৭ হাজার ৬০২টি কারখানার মধ্যে পোশাক খাতকেন্দ্রিক কারখানার সংখ্যা ৩ হাজার ৩৭২। এসব কারখানার বাইরে চামড়াজাত পণ্য, আসবাব, সেলফোন সংযোজন, ওষুধ সব খাত মিলিয়ে অন্যান্য কারখানা আছে ৩ হাজার ৮৬৬টি।
গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে কভিড-১৯-এর উৎপত্তির পর এর প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ২৬ মার্চ বাংলাদেশে শুরু হয় সাধারণ ছুটি। অল্পসংখ্যক কারখানা বাদে তখন ছয় শিল্প এলাকায় সাত হাজার কারখানা পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়েছে। শিল্প-কারখানার জন্য লকডাউন সীমিত করা হয় ২৬ এপ্রিল। সেই থেকে কারখানা পর্যায়ক্রমে খুলেছে। খাতভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ময়মনসিংহ এই ছয় শিল্প এলাকায় পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানা আছে ১ হাজার ৮৮২টি যার মধ্যে ৯ জুলাই ১ হাজার ৪৯২টি খোলা থাকলেও বন্ধ ছিল ৩৯০টি। আরেক সংগঠন বিকেএমইএ সদস্য কারখানা আছে মোট ১ হাজার ১০১টি। এরমধ্যে গত ৯ জুলাই খোলা ছিল ৫০৮টি, বন্ধ ছিল ৫৯৩টি। এলাকাভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, কারখানা সবচেয়ে বেশি বন্ধ নারায়ণগঞ্জ এলাকায়। ওই এলাকায় সব খাত মিলিয়ে মোট কারখানা আছে ২ হাজার ৪১১টি। এরমধ্যে ১ হাজার ৩৩১টি কারখানা খোলা থাকলেও ৯ জুলাই বন্ধ ছিল ১ হাজার ১২৮টি কারখানা।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের পরে কারখানা বেশি বন্ধ গাজীপুর এলাকায়। ওই এলাকার মোট ২ হাজার ৭২ কারখানার মধ্যে ৯ জুলাই খোলা ছিল ১ হাজার ৬৪৭টি, বন্ধ ছিল ৪২৫টি। চট্টগ্রামের মোট ১ হাজার ২২৯ কারখানার মধ্যে খোলা ছিল ৯০৮টি, বন্ধ ছিল ৩২১টি। আশুলিয়া এলাকায় মোট ১ হাজার ৩৫৬ কারখানার মধ্যে ৯ জুলাই খোলা ছিল ১ হাজার ২৩৫টি, বন্ধ ছিল ১২১টি কারখানা। খুলনা এলাকায় মোট ৩৫৫টি কারখানার মধ্যে খোলা ছিল ৩৪০টি, বন্ধ ছিল ১৫টি। ময়মনসিংহ এলাকার মোট ১৩১টি কারখানার মধ্যে ১৩০টিই খোলা ছিল, বন্ধ ছিল ১টি। শিল্প গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধের কারণ কারখানাভেদে ভিন্ন। তবে মোটা দাগে কাজের অভাব যেমন বড় কারণ, আবার কারখানা মালিকের আর্থিক অসঙ্গতিও আছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানাগুলো উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না কাজের ঘাটতিতে। আসন্ন মন্দা মোকাবিলায় শিল্প-কারখানাগুলো ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা নিয়েছে। আবার উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত কাজও নেই কারখানাগুলোয়। বর্তমানে কারখানাগুলো সাকুল্যে উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র অর্ধেক ব্যবহার করতে পারছে। অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে বাকি অর্ধেক। এ ধারাবাহিকতায় অনেক কারখানা বন্ধই থাকছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, সম্প্রতি বন্ধের তালিকায় নতুন সংযোজন দেখা গিয়েছে। ৩৪৮টি কারখানার মধ্যে ২৬৮টি কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছে। বাকিগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এভাবে শিল্প সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রতিফলিত হবে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও। আমরা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কারখানাগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় বজায় রেখেছি। ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি সরকারের সঙ্গেও সমন্বয় করছি। পরিস্থিতি মোকাবিলা ও উত্তরণের জন্য অনেক নীতিসহায়তার প্রস্তাবও আমাদের রয়েছে। সরকারের সঠিক নীতি-সহযোগিতায় অতীতের মতো এবারও সংকট থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে যাব।
বিজিএমইএ জানায়, পোশাক খাতে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া কোন নতুন ঘটনা নয়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর নিরাপত্তা ইস্যুতে হাজারেরও বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বিনিময় হারের প্রভাবে আর্থিক সংকটের জেরেও কারখানা বন্ধ হয়েছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কারখানা বন্ধ হয়েছে ৬০টিরও বেশি।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে কোন শিল্পেরই পূর্ণ সক্ষমতায় চলার কাজ নেই যার প্রতিফলন ঘটছে কারখানা বন্ধ হওয়ার চিত্রে। আগামী তিন-চার মাসে কেউ বলতে পারবে না অবস্থার উন্নতি কখন হবে। কাজ আসতে শুরু করলেও তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। তাই বলা যায়, আপাতত উন্নতি অনেক কম।
জানা গেছে, বিকেএমইএর ৮৩৮ সক্রিয় সদস্যের মধ্যে সরাসরি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত কারখানা রয়েছে ৭৩৭টি। কিছুদিনের মধ্যেই সংগঠনটির সদস্য অন্তত ১০০ কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। শঙ্কা রয়েছে অনেক উদ্যোক্তারই ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়ারও।
