তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বহিষ্কার (সমাজচ্যুত) করার অমানবিক অভিযোগ উঠেছে সমাজের একাংশের প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী মহলের বিরুদ্ধে। গত ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জুম্মার নামাজের আগে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এই বহিষ্কারাদেশ কার্যকর করা হয়। এর পর থেকেই অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবার চরম মানসিক ট্রমা ও সামাজিক অবমাননার শিকার হয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

ঘটনার বিবরণীতে জানা যায়, কিছুদিন আগে শাওন মাহমুদ (ছদ্মনাম) নামের এক ব্যক্তির সাথে এক দিনমজুরের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি ও মারামারিতে রূপ নেয়। এতে উভয় পক্ষই সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হন। তবে দিনমজুরের হাতে আঘাত লেগে ফুলে যাওয়ায় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁর হাতে ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অভিযোগ উঠেছে, এই ঘটনাকে পুঁজি করে স্থানীয় একটি মহল দিনমজুরের আঘাতপ্রাপ্ত হাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন আদায় করে তাদের ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তারা একতরফাভাবে একটি ‘গণবিচার’ বা সালিশের আয়োজন করে এবং শাওন মাহমুদের ওপর ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযুক্ত শাওন মাহমুদ উক্ত গণবিচারে উপস্থিত না হয়ে এত বড় অঙ্কের টাকা পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি ঘরোয়া পরিবেশে ২/৪ জন গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে মীমাংসা করার অনুরোধ জানান। কিন্তু সালিশকারীরা সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে।

পরিস্থিতি শান্ত করতে একপর্যায়ে স্থানীয় মসজিদ কমিটি উদ্যোগ নেয়। তারা নামাজের পর মসজিদের ভেতরে অভিযুক্ত শাওন মাহমুদকে নিয়ে একটি সুষ্টু সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনায় বসেন। কিন্তু সমাজের ওই মহল পবিত্র মসজিদের অভ্যন্তরেও হট্টগোল সৃষ্টি করে এক ভীতিকর ও বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি করে এবং শান্তিপ্রিয় আলোচনাটি পণ্ড করে দেয়।

পরবর্তীতে শাওন মাহমুদ নিজে উদ্যোগী হয়ে ভুক্তভোগী দিনমজুরকে নিজ বাড়িতে ডেকে এনে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং চিকিৎসার খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেন। এতে ভুক্তভোগী দিনমজুর সন্তুষ্ট হলেও স্থানীয় ওই মহলটি অসন্তুষ্ট হয়। তারা বারবার গণবিচার এবং ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের দাবিতে চাপ দিতে থাকে এবং শাওন মাহমুদের দেওয়া ১০ হাজার টাকা জোরপূর্বক ফেরত দেয়।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শাওন মাহমুদের বৃদ্ধা মা নিজে ভুক্তভোগীর কাছে গিয়ে পুনরায় ক্ষমা চান এবং ৮ হাজার টাকা প্রদান করেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ওই চক্রটি ভুক্তভোগীর কাছ থেকে টাকা রেখে দিয়ে তাকে তার দেশের বাড়ি কুড়িগ্রামে পাঠিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তারা আবারও শাওন মাহমুদের পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে।
দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করতে অপারগতা প্রকাশ করায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জুম্মার নামাজের আগে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে শাওন মাহমুদ ও তাঁর পরিবারকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এই ঘটনার পর থেকে শাওন মাহমুদের পরিবার চরম মানসিক চাপ ও অপমানের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। লোকলজ্জা ও সামাজিক হেনস্থার ভয়ে পরিবারের কোনো সদস্য বাড়ি থেকে বের হতে বের হচ্ছে না। বর্তমানে পরিবারটির মানসিক অবস্থা এতটাই নাজুক যে, যেকোনো সময় বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর বা আত্মঘাতী ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এলাকার সচেতন সুধীসমাজের মতে, দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং পবিত্র ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করে এভাবে কাউকে সমাজচ্যুত বা একঘরে করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। ভুক্তভোগী পরিবারটিকে এই চরম ট্রমা ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এবং বিষয়টির একটি সুষ্ঠু ও আইনি সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তাঁরা।

বিজ্ঞপ্তি: মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বক্তব্য ও মতামত সম্পূর্ণরূপে সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব। 

এই ধরনের আরও খবর

সর্বশেষ খবর