প্রায় সব দেশেই রয়েছে পেঁয়াজের চাহিদা। আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়। পেঁয়াজ আমাদের অন্যতম মসলা জাতীয় ফসল। মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে উৎপাদনের দিক দিয়ে পেঁয়াজ আমাদের প্রধান ফসল। সারা বছরে আমাদের পেঁয়াজের চাহিদা ২২-২৫ লাখ টন। এর মাঝে আমাদের কৃষকরা উৎপাদন করেন প্রায় ১৮ লাখ টন। সে ক্ষেত্রে বছর জুড়ে দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি থাকে মাত্র সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ টন। এই ঘাটতি প্রতিবছরই থাকে। এই ঘাটতি মেটাতে রয়েছে পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ।
ব্যবসায়ীরা সরকারি নীতিমালার মধ্যে থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেন।মসলা জাতীয় এই সবজিটি ছাড়া রসনার তৃপ্তি মেটে না বাঙালির। খাবারকে মুখরোচক করে তোলে পেঁয়াজ। ফলে এর কদর কখনই কমার নয়। আমাদের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। আর সেই সুযোগটিই কাজে লাগায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। প্রতিবছরই পেঁয়াজের ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে দাম বাড়ানো হয় পেঁয়াজের।
সেই দাম উঠতে উঠতে এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে, যা সাধারণের ক্রয়সীমায় যেমন থাকে না, তেমনি সরকারের জন্যও তা বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়। এবারও আমাদের বাজারে পেঁয়াজের যে ঘাটতি রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে পেঁয়াজের দাম। এর সঙ্গে যোগ হয় হঠাৎ করে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি না করার সিদ্ধান্ত। আমাদের পেঁয়াজের ঘাটতি মেটানো হয় প্রধানত ভারত থেকে আমদানির মাধ্যমে।
পাশর্^বর্তী দেশটিও পেঁয়াজের ঘাটতির কারণে হঠাৎ করেই রফতানি বন্ধ করে দেয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পেঁয়াজের দামের যে লাগাম ছুটে যায়, তা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অথচ ভারত তাদের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করলেও মিয়ানমার, মিসর, চীন, তুরস্ক ও আগের এলসি খোলা ভারতীয় পেঁয়াজ এর মাঝে দেশে এসেছে। কিন্তু দাম কমেনি। পেঁয়াজের দাম না কমার পেছনে দেশের প্রধান দুই পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এবং ঢাকার শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দায়ী বলে একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
‘পাইকারি পর্যায়েই আমদানি মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাতুনগঞ্জের আমদানিকারকরা আগের এলসি খোলা পেঁয়াজ ৪২ টাকা কেজি দরে আমদানি করলেও তারা পাইকারি বাজারে বিক্রি করছে ১০৫ টাকায়। অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়েই পেঁয়াজের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে।
সোনার হরিণ হয়ে ওঠা পেঁয়াজ যেন সাধারণের নাগালে থাকে সে জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সরকার খোলাবাজারে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। টিসিবির পক্ষ থেকে খোলাবাজারে মাত্র ৪৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি হলেও অন্যান্য বাজারে সেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা দরে।
পেঁয়াজের দাম কমা প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, মিসর থেকে আমদানির পেঁয়াজ পৌঁছলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দাম কিছুটা কমে আসবে।
প্রতিবছর বাজার অস্থিতিশীল করে পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর এই কারসাজি বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দাম বেড়ে যাওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সচেষ্ট না হয়ে, দাম বাড়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দেশে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ কত, আমাদের চাহিদা কতÑ এই দুইয়ের হিসাব মিলিয়ে নিতে হবে আমদানির সিদ্ধান্ত। যাতে করে প্রয়োজনীয় পেঁয়াজ মজুদ থাকে। হঠাৎ করে কেউ পেঁয়াজের দাম না বাড়াতে পারে। একইভাবে দেশের ভেতরে আমাদের কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে। কৃষকের নায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় বাজার থেকে যথাসময়ে সরকারকেই পেঁয়াজ সংগ্রহে উদ্যোগী হতে
হবে, যাতে করে আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমে। আর বছর বছর যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে হবে।
