নিজস্ব প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে একই জমির মালিকানা দাবি করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। উপজেলার কুড়িপাড়া মৌজার সিএস ৮১৩ ও ৮১৪ নম্বর দাগের ৩৬ শতাংশ জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এ বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের দাবির পক্ষে দলিল ও রেকর্ডের কথা উল্লেখ করেছে এবং বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪১ সালের ১২ আগস্ট হাকিম উদ্দিন সেকের কাছ থেকে মো. ওয়াহেদ আলী সেক ২১ শতাংশ জমি সাব-কবলা দলিলমূলে ক্রয় করেন। এরপর ১৯৪৩ সালের ৩ নভেম্বর মোহাম্মদ আলী সেকের কাছ থেকে একই দাগ-খতিয়ানে আরও ১৫ শতাংশ জমি সাব-কবলা দলিলমূলে ক্রয় করেন তিনি। এভাবে একই দাগ-খতিয়ানে মোট ৩৬ শতাংশ জমির মালিক হন ওয়াহেদ আলী সেক।
পরবর্তীতে ওয়াহেদ আলী সেকের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে আরএস জরিপ হলে ওই ৩৬ শতাংশ জমির মধ্যে ২৪ শতাংশ পলান গংদের নামে এবং বাকি ১২ শতাংশ জমি আব্দুল গফুর গংদের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। তবে ১২ শতাংশ জমি গফুর গংদের নামে কীভাবে বা কোন ভিত্তিতে রেকর্ডভুক্ত হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো পক্ষের কাছেই তথ্য নেই বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে বিআরএস জরিপ শুরু হলে বিআরএস ২৫১১ নম্বর দাগে ২৪ শতাংশ জমি পলান গংদের নামে এবং ১২ শতাংশ জমি গফুরের পরবর্তী ওয়ারিশদের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়।
সরেজমিনে গিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা হয়।
এক পক্ষের তোফাজ্জল হোসেন তারিমুদ্দিন বলেন, দুটি দলিলের মাধ্যমে ওয়াহেদ আলী ৩৬ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন, এটি তারা স্বীকার করেন। তার দাবি, ১২ শতাংশ জমি তার মামা গফুরের নামে আরএস রেকর্ড হয়। পরবর্তীতে তার মায়ের কাছ থেকে ওয়ারিশ সূত্রে তারা ওই জমির মালিক হন এবং ওয়ারিশ সূত্রে তাদের নামে সঠিকভাবে বিআরএস রেকর্ডও হয়েছে। নিজ নামে নামজারি করে তারা দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন বলেও জানান তিনি।
তোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি পলানের ছেলে বাদল মিয়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তার ছেলেকে মারধর করে তাদের দখলীয় ১২ শতাংশ জমি জবরদখলের চেষ্টা করছেন এবং ওই জমিতে বেড়া দিয়েছেন। এ ঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন জানিয়ে বলেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আদালতের যেকোনো রায় তিনি মেনে নেবেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে অপর পক্ষের বাদল মিয়া বলেন, তার দাদা ওয়াহেদ আলী সিএসের মূল জোতদারদের কাছ থেকে দুটি সাব-কবলা দলিলমূলে জমি ক্রয় করে ৩৬ শতাংশের মালিক হন। তার দাবি, আরএস জরিপের সময় ভুলবশত ওই ৩৬ শতাংশের মধ্যে ১২ শতাংশ জমি অন্যের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। সম্প্রতি তারা ওই জমির দলিল খুঁজে পেয়েছেন এবং দলিলের ভিত্তিতে জমিটি বুঝে নিয়েছেন।
বাদল মিয়া বলেন, জমির ধারাবাহিকতা সংশোধনের জন্য তারা আদালতে মামলা করেছেন। আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে আদালতের যেকোনো রায়কে তারা স্বাগত জানাবেন।
পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন পত্রিকায় তাকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে উল্লেখ করে তিনি ওই সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী ডালিমন নেছা, শামীম মিয়া, রুবেল মিয়াসহ স্থানীয়রা বলেন, আজগানা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি বাদল মিয়ার সম্পত্তি দীর্ঘদিন বেদখলে ছিল। ওই জমিই তারা পুনরায় দখলে নিয়ে বেড়া দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, এটি বাদল মিয়া ও তার পরিবারের প্রাপ্য সম্পত্তি এবং দলিলমূলে তারা এর মালিক।
স্থানীয়দের দাবি, জমি দখলকে কেন্দ্র করে বাদল মিয়া ও তার পরিবারের সঙ্গে কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি। এমনকি প্রতিপক্ষরাও ঘটনাস্থলে আসেনি বলে তারা জানান। বাদল মিয়া কোনো দখলবাজ ব্যক্তি নন দাবি করে স্থানীয়রা বলেন, তারা তাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন ও জানেন।
স্থানীয় বর্তমান ইউপি সদস্য হাজী সানোয়ার হোসেন বলেন, এক পক্ষ ১৯৪১ ও ১৯৪৩ সালের দলিলের ভিত্তিতে এবং অপর পক্ষ আরএস ও বিআরএস রেকর্ডের ভিত্তিতে একই জমির মালিকানা দাবি করছে। উভয় পক্ষই আদালতে মামলা করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি দু’পক্ষকেই সংযত আচরণ ও ধৈর্যধারণের আহ্বান জানাচ্ছি। আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত সবাই যেন ধৈর্য ধরেন। পাশাপাশি বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
জমি নিয়ে মারামারির বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য হাজী সানোয়ার হোসেন বলেন, জমিতে কোনো মারামারি হয়নি। অন্য কোথাও হয়েছে কি না, তা তিনি জানেন না। তবে বাদল মিয়া ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আগে কখনো কোনো অভিযোগ পাননি বলেও জানান তিনি।
উভয় পক্ষই আদালতে মামলা দায়ের করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির কথা জানিয়েছে।
